Translate

Saturday, July 16, 2016

।। অভিবাদন ।।

।। জিতেশ ভট্টাচার্য।।
============
অভিবাদন স্বীকার করো আজ
হে অন্তহীন সামুদ্রিক বিজয়মিছিল
থাকে যদি তবু থাকুক অটুট
অদৃশ্য চতুর্থমাত্রিক নিশ্ছিদ্র কারাগার
সন্ধি হোক নির্ণায়ক শর্তবিধানে
মধ্যস্থ শিশুর হাতে সাক্ষ্য-হস্তাক্ষরে
সংরক্ষিত হবে সুষম বরদান


অগ্নিশলাকা থেকে খসে যাবে বারুদ
পর্যায়ক্রমে জন্ম নেবে ক্ষুদ্র কুসুম
থেমে যাবে একদিন অনবধানে
অকস্মাৎ ছদ্মবেশী গুপ্ত হন্তারক
নবযুগ প্রারম্ভের কালে বলে দিও
কানে কানে ক্ষুৎপিপাসার সহজ নিবারণ
আজ শুধু স্বীকার করো নম্র অভিবাদন।

।। বিষাদবিস্তার ।।

।। জিতেশ ভট্টাচার্য ।।
============
মধ্যাহ্নরাগে সুরের ওঠানামা শুনি
অজান্তে মনে পড়ে ইচ্ছামৃত্যুর কথা
বাসনার মহীরুহ হতে শেষ সম্বল
খসে পড়ে অগোচরে প্রায়পক্ক ফল
বিষাদবিস্তার ছুঁয়ে যায় মন্দ্রমধ্যম
লম্বিত ছায়ায় হাসে পিষ্ট তৃণমূল
উচ্ছল উচ্ছাস দেখো স্মৃতিভারে স্থির
বেলা গড়ায় ধীরে ষড়জ-গম্ভীর।

।। জ্যোতিসংবরণ ।।

।। জিতেশ ভট্টাচার্য ।।
=============

দৈন্যের ভাষা
নয় কোনো অদম্য জিগীষা
ভুল যদি ভাবো ঢেকে যাবে
পূর্ণতঃ কলঙ্ক তমসা
সে ঘোর অন্ধকারে
করো হে জ্যোতিসংবরণ
আসুক মোক্ষম সময়
ছিন্ন হবে সকল বন্ধন।

।। গূঢ় সীমন্তিনী ।।

।। জিতেশ ভট্টাচার্য ।।
===========

নদী জানে সব কথা আদ্যন্ত বিস্তারে

ওষ্ঠাগত প্রাণে ত্রাণ নিষ্কৃতির দ্বারে

লাগাম ছিঁড়েছে বৃথা ভাবের উজান

কেন সখা গড়ে দিলে অলীক উদ্যান?

বাকী নেই আর কোনো গূঢ় সীমন্তিনী

ডুবন্ত এ উপচ্ছায়া তটস্থ কাহিনী

ঋষিকল্প উদাসীন আক্ষেপব্যথায়

আষাঢ়ে বিশ্বাস-জরা আজ ছুটি চায়।

।। লক্ষ্যহীন ।।

।। জিতেশ ভট্টাচার্য ।।
=========
মুখবন্ধে ছিল অন্য প্রতিশ্রুতি

পরিজনে ভরা ঘর মুগ্ধ সন্ততি

মধুকর ফিরে যায় পুনরায় ভ্রমে

বিবৃত সে কাহিনী সাগর সঙ্গমে

পদাবলী সুরে তার দেখা পাই

জেগে ওঠে কলরবে নিভৃত সরাই

উৎসবে অনাহূত, রবাহূত জন

লক্ষ্যহীন পরিযায়ী অন্তে পর্যটন।

।। নিস্তার চাই ।।

।। জিতেশ ভট্টাচার্য ।।


নিস্তার চাই বৈধ আলোড়ন হতে

আরোগ্যপ্রলেপ চাই পুরাতন ক্ষতে

রিক্ত অঙ্গার হতে জাগো আজ প্রাণ

মুছে দাও অপমান, অনর্থ-প্রমাণ

নিভন্ত প্রদীপে দেখো আভা ম্লানমুখ

দ্রুতহাতে মুছে নাও ঝাপসা সে চোখ

গলা ছাড়ো ‘স্বাগতম’ গুপ্ত উপহাসে

মিশে যাক অট্টহাস মেঘলা আকাশে।

।। স্তব্ধ মধ্যযাম ।।

।। জিতেশ ভট্টাচার্য ।।

হে নিমগ্ন সুবর্ণরেখা
দিয়েছো আশাতীত দান
নিভৃত এ পরবাসে প্রিয়
সাজিয়ে দিয়েছো অনন্ত অন্তরাল
দিবারাত আসে কত যাযাবর
পরিভ্রমী মানস আর পক্ষীগত প্রাণ
দীর্ঘশ্বাসে ভার হয়ে ওঠে
ভুলপথ ধরে আসা শ্রান্ত করবাল


আবার এসেছে ফিরে নির্মম
চতুর সে কায়াহীন সর্বস্বাপহারী
তিমিরান্ধ অসহায় নির্বাক জনতা
পূজ্য আবহমান দেবতাপাষাণ
মরীচিকা ছেয়ে আছে নগণ্য জীবনে
বিজ্ঞ সাজে সুশোভন ব্যর্থ পেশাদারী
পতনের ধ্বনি শোনো স্তব্ধ মধ্যযামে
দেবে কি কোথাও কেউ কোনো প্রতিদান?

স্রষ্টার অভিপ্রায়


II দেবাশিস ভট্টাচার্য II

রাতের আকাশে ফুটে থাকা গ্রহ তারার দিকে তাকিয়ে কখনও কি আমাদের মনে হয় যে ব্রহ্মাণ্ডের অপর প্রান্তে ঠিক সেইসময় কোন জীব ঠিক ওইভাবেই অবাক বিস্ময়ে তার আকাশকে দেখছে? হয়তো তার আকাশ আমাদের আকাশ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে হয়তো কোন ছায়াপথ নেই, আছে আকাশ জুড়ে রঙ বেরঙের বিচিত্র নকশা। হয়তো তার আকাশে একাধিক চাঁদ, তার মধ্যে কোনটা হয়তো আকারে আমাদের চাঁদের থেকে অনেক বড়। সেই জীবটির মনে মহাবিশ্বের ছায়া যে ভাব জাগায় তা আমাদের মনের অবাক বিস্ময়ের থেকে কতটুকু আলাদা? চাঁদের শরীর থেকে ঠিকরে আসা আলোয় যখন তার চারপাশ উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে, তার মনে কি প্রতিক্রিয়া হয়? সেটাকে কি আমাদের আনন্দের সমগোত্রীয় কিছু বলা চলে?


রবীন্দ্রনাথ বলেছেন স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টিকে আমাদের চোখ দিয়েই অবলোকন করেন। তিনি আসলে উপনিষদের কথাটাকেই অন্য ব্যঞ্জনা দিয়েছেন- ‘তৎ ত্বম অসি’। কিন্তু অতিকায় এই ব্রহ্মাণ্ডের এক কোণে ক্ষুদ্র বালুকণার মত কোন একটি গ্রহের একটি বিশেষ জীবকেই তিনি কেন বেছে নেবেন? তাঁর অহৈতুকী এই কৃপা যেন অবিশ্বাস্য মনে হয়।

জীবনের বিকাশের জন্য যা যা প্রয়োজন, তেমন সব আয়োজন ব্রহ্মাণ্ডে বহু গ্রহেই আছে – এই নিয়ে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত। তাদের মধ্যে উন্নত কোন জীবের বাসভূমি হয়ে ওঠার সম্ভাবনাময় গ্রহের সংখ্যাও কম নয়। স্রষ্টা তাই সম্ভবতঃ সহস্র চক্ষু দিয়ে তাঁর সৃষ্টিকে দেখছেন- ‘সহস্রশীর্ষাপুরুষঃ সহস্রাক্ষঃ সহস্রপাদ’। মানুষের ক্ষেত্রে দুই চোখের দৃশ্যপট তার মস্তিষ্কে গিয়ে মিলেমিশে বোধে ধরা দেয়। সৃষ্টির দুই প্রান্তে থাকা দুটি জীবের অনুভূতি কখনও একে অপরের ছোঁয়া পাবে না। তবে কি তারা সর্বব্যাপী কোনো চেতনার বা ধীশক্তির অঙ্গ? যাকে গায়ত্রীমন্ত্রে স্মরণ করা হয়-‘ ভর্গো দেবস্য ধীমহি ধিয়ঃ যো নঃ প্রচোদয়াৎ’? কী অভিনব কল্পনা! তাঁরই প্রেরণ করা ধীশক্তি দিয়ে তাঁর জ্যোতির্ময় রূপকে কল্পনা করি- ভূঃ ভূবঃ স্বঃ তৎ সবিতুর্বরেণ্যং - যিনি এই ভূলোক, দ্যুলোক, সবিতারূপে বিভাসিত।

মহাবিশ্বে প্রতিমুহূর্তে যেমন সৃষ্টির যজ্ঞ চলছে, তেমনি চলছে ধ্বংসলীলা। তীক্ষ্ণ আর্তনাদের মত তীব্র বিকিরণ ছড়িয়ে দিয়ে দেশকালের গহ্বরে মিলিয়ে যাচ্ছে নক্ষত্র, গ্রহ, বস্তুপিণ্ড, আবার কোথাও প্রভাতসূর্য পরম মমতায় তার কিরণ মাখিয়ে দিচ্ছে তুচ্ছ তৃণের গায়ে। আমাদের জাগতিক জ্ঞান সৃষ্টিকে মমতা আর ধ্বংসকে ক্রুরতার সাথে এক করে দেখে। ঈশ্বরকে তাই আমরা কখনও পরম করুণাময় আবার কখনও রুদ্রবেশে কল্পনা করি। হয়তো তা আমাদের চিন্তার, আমাদের কল্পনার দীনতা।এই বিশ্বের যদি কোন সত্তা থেকে থাকে তা হয়তো সত্যিই নির্গুণ। যে মাত্রায় বা ডায়মেন্সনে আমরা বাঁধা পড়ে আছি, তাতে কার্যকারণ আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে চলে। তার বাইরের সামগ্রিক ছবি হয়তো আমাদের বোধে কখনো ধরা দেবে না।

বহু প্রশ্ন- দর্শন, ধর্ম, বিজ্ঞান নিজের নিজের পথে তাদের উত্তর খুঁজে চলেছে। পথ দুরূহ- সৃষ্টির একটি ক্ষুদ্র অংশ হয়ে যেখানে আমরা পূর্ণ সৃষ্টিকে বোঝার প্রয়াস করছি, কাজটা সহজ হওয়ার কথা নয়।আদৌ সেটা সম্ভব কিনা তাও জানা নেই। আদিকাল থেকে মানুষের সংগ্রাম চলেছে প্রতিকূলতাকে জয় করে সুখ পেতে, সেই সুখ, যা আমাদের দেহকে আরাম দেয়। তবু জিজ্ঞাসুরা একসময় বুঝতে পেরেছিলেন এই সুখ আপেক্ষিক, তা সত্য হতে পারে না। ‘যো বৈ ভূমা তৎ সুখম্ নাল্পে সুখমস্তি’। বিরাটের সংস্পর্শে এসে যে সুখ দেহকে ছাপিয়ে যায়, তাই অক্ষয়, তাই অমৃত, তাই আনন্দ। ব্রহ্মাণ্ডের যে কোণই সে দাঁড়িয়ে থাক, যদি তার চিন্তাধারা উন্নত মানের হয়, সে সৃষ্টির বিশালতাকে জরীপ করার প্রয়াস করবেই।আর এই প্রয়াসই তাকে সন্ধান দেবে আনন্দের। কে জানে, এর মধ্যেই নিহিত হয়ে আছে কিনা স্রষ্টার গূঢ় অভিপ্রায়?

Friday, July 15, 2016

।। প্রস্থানের দিকে ।।

।। জিতেশ ভট্টাচার্য ।।


সকল বন্ধন ছিঁড়েছে সন্তাপ, নিমগ্ন সান্নিধ্যে সুখ স্বস্তিবচন
অবিরাম দংশনে হীনবল পাপ, সত্যচক্ষুকর্ণময় বিবাদভঞ্জন


আহত বিস্ময় বিদ্রোহে গড়ায়, একত্রে বিবর্ণ সশোণিত স্বেদ
বৈরী গৃহকোণে জমাট প্রমাদ, দৈব ইচ্ছাক্রমে এই লক্ষ্যভেদ

গৃহযুদ্ধ এগোয় সন্তর্পণ পদে, অন্তর্জলী যাত্রাপথে সজ্জিত রথ
বঙ্কিম গতিময় স্ফূর্ত্ত বাহিনী, করুণ সুরে বাজে কোমল ধৈবত

অনন্ত জিজ্ঞাসা বুকে একটি প্রভাত জেগে ওঠে অভয় প্রতীকে
মরণকামড়েও রসাতলমোহে ঘুরে যায় পথরেখা প্রস্থানের দিকে।

।। বিহঙ্গনয়ন ।।


।। জিতেশ ভট্টাচার্য ।।

প্রতিরূপ আনন্দস্রোতে ভাসে

তারপর কেউ কথা রাখে না

বৈজয়ন্ত নিশান ওড়ে ক্লান্তিহীন

নিশ্চিন্ত গৃহকোণ থেকে মৃদুলয়ে

অনুকূল ঋতুসুখে বায়ূসন্তরণ

তৃপ্তি আস্বাদে মন বিষাদবিমুখ

বিহঙ্গনয়ন খোঁজে উন্মুক্ত দুয়া্রে

অধীর অপেক্ষমানা দুহিতা বা মাতা।

।। পরিভাষা ।।


।। জিতেশ ভট্টাচার্য।।

কুশলেই আছে সমূহ কৌশল

ভণিতার চকমকি ভব্য আলয়ে

সজ্জিত পুষ্পদণ্ড ভূমিপাচ্য নয়

কৃত্রিম শোভায় আংশিক সন্তোষ

প্রীতিময় পাপচক্র অবিরাম ঘোরে

নগর ছাপিয়ে মেশে গ্রাম্য মেলায়

অনায়াস কুচক্রের শয্যাকুসুম

সন্তাপ-আতুড় হবে অনিবার্য কাল

এবার ভূমিগত হও হে প্রাণ

অন্তঃস্থ আকুতিতে উপ্ত হোক আশা

এসো বাঁচি আরো কিছুদিন

উত্তরপুরুষে বলি কিছু পরিভাষা।

শ্রেণীটি দ্বিতীয়

II জিতেশ ভট্টাচার্য II

শ্রেণীটি দ্বিতীয় যদিও
তুমি নাকি পূর্ণ নাগরিক
এমনটিই বলেছে সবাই
নিশ্চিন্তে ঘুমোয় যারা নিরবধি
স্বাস্থ্যচিন্তায় বিশদ আকুল
আঁতিপাতি খোঁজে মৃতদেহে;
কোথায় সে প্রাণঘাতী হুল!
.
অশান্ত বসতির প্রতিটি দেয়ালে
নিয়মিত তারা ঘুঁটে দিয়ে যায়
গভীর নিষ্ঠায়। এভাবেই
বহতা সংস্কারের প্রতিবাদ
নান্দনিক পূজো উপচার
নির্বাসিত ধর্মরাজ্য থেকে
ঢেঁকি গিলে ইষ্ট প্রতিহার।
.
ঘাম হয় ঘনঘন তার
রন্ধ্রে রন্ধ্রে তবু থাকে জ্বর;
অপদেবতার দুরারোগ্য দৃষ্টিক্ষেপে
প্রার্থনার অভ্যাসগীতি:
‘প্রভু আমার, হে আমার প্রিয়,
সকলি দিয়েছো জীবনে;
শুধুমাত্র শ্রেণীটি দ্বিতীয়’।

।। ছেঁড়া চিরকূট ।।

।।জিতেশ ভট্টাচার্য ।।

অনবদ্য গীতিময় নিসর্গ নীরব
ব্যাপ্ত কথকতা শুধু শোনে আমরণ
আস্তিনে প্রভূত পাপ চোরাকাঁটা বন


পেয়েছি অকস্মাৎ এক ছেঁড়া চিরকূট
আবেগের মুখে চাপা অনাপোষ ছিপি
বনবাসী রোজনামচা, অসমাপ্ত লিপি

খেলাচ্ছলে ভাসালে এ কোন প্লাবনে
ভাঙাগড়া খেলামাঝে উদ্দাম বেগ
উড়ে যায় উদাসীন লঘুচিত মেঘ

লুকোনো বাগানে আছে দুটি চারাগাছ
বলিনি ভ্রমেও কোনো মত্ত আসরে
হোক ক্রমে অভ্রলেহী গোপন আদরে

নিস্তরঙ্গ তৃপ্তি চেনে প্রশান্ত নহর
দমিত কামনাস্রোত জানেনি সে কথা
গহীন কুম্ভকে ডোবা সত্ত্ব মাদকতা।

শ্লোগান

।।জিতেশ ভট্টাচার্য ।।

অগ্নিতৃষা
পতঙ্গের বুকে
দুরারোগ্য ব্যাধির মতন
তটস্থ প্রাণীকুল
সংক্রমণ-ভীত
শুধু জানে চর্বিত চর্বন
পরিচিত গৃহ
যেন সে আমার
ছিল না কখনো কোনোকালে
বালিতে গোঁজা
মুণ্ডু প্রাণহীন বলে
শ্লোগানেই জগৎ মাতালে!!

নিঃসঙ্গ বন্দর

।। জিতেশ ভট্টাচার্য ।।

মর্ম কোথায় রাখো নিঃশর্ত্ত বন্ধক
লক্ষ্যহীন বার্ষিক গোপন পর্যটনে
একাকী কেন যাও আষাঢ়ের ভেক?


প্রহরা অগ্রাহ্য করে নিশি ডাকে
অঝোর বর্ষায় আকাশের নীচে
কখনো পেছন ফিরে তাকাও ক্ষণেক?

অলিগলি জটলায় প্রত্যাশার আশা
একঘেয়ে সুরে বাজে ভবিষ্যপুরাণ
ঘনিয়ে তমসা আসে নিঃসঙ্গ বন্দরে

অনিবার্য ছিল সব জয়-পরাজয়
তবু গূঢ় ভালোবাসা নিহিত পরস্পরে
দয়িত-হৃদয়, শোনোনি তা দৈব কণ্ঠস্বরে?

।। আয়ূমন্থন ।।

II জিতেশ ভট্টাচার্য II

সত্য মিথ্যে যা বোঝার
বোঝো হে স্বাধীন অধ্যবসায়
অনবধানে রহস্য কিছু থাকুক
বিবৃতিহীন অগম্য অতীতে
কলরবশূণ্য আড়ালে মূক
আন্দোলিত দুর্বল শাখার মত
নিমজ্জিত বাতাসের স্বাদগ্রহন বিনা
বাকি থাকে কী বিকল্প আর
অনুপুঙ্খ আয়ূমন্থনে সম্ভাব্য উত্থান
অমৃত বা অবিমিশ্র নীলাভ তরল
নীতিগত স্বচ্ছতার প্রসঙ্গে এসে
উচ্চ পর্বতমালা যেন স্থির সমতল।

।। আলাদিন ।।



II জিতেশ ভট্টাচার্য II

বন্ধনজাত প্রীতিময় সকাল
সমাহিত নিদ্রার মধ্যরাত
বজায় রেখেছো ধর্মযজ্ঞে
সামন্তপ্রথা; সিদ্ধ নিপাতন
মহাকালে দ্রব হবে উপাসনা
বিদ্যুচ্চমকে সকলি আলোময়
বলো নি কী করে চকিতে
উধাও নিবিষ্ট অবগুণ্ঠন
‘অপ্রাপ্য কিছু নেই’ আছে
আলাদিন-প্রদীপের দানো
হারিয়েছে শুধু ব্যস্ত যাপনে
গুটিকয় সামান্য প্রাণস্পন্দন।

।। ভিখিরির সিংহদুয়ার ।।

II জিতেশ ভট্টাচার্য II

সমৃদ্ধ পসরার রত্নসম্ভারে লুকোনো কুসুম দুঃখভারে
উঁকি দেয় অঝোর শ্রাবণ পুরাতন ব্যাধির আকারে
অবৈধ সংকল্প নিয়ে ফিরে আসে বিতাড়িত চক্রবাক
সংবর্দ্ধনাসভায় উলুধ্বনি হোক, বাজো শত মঙ্গলশাঁখ
একে একে পর্যায় প্রত্যুষে দগ্ধ জীবের দীর্ঘ কাতার
সশস্ত্র প্রহরী আড়ালে সুরক্ষিত ভিখিরির সিংহদুয়ার
মলিন মুখশ্রী প্রোথিত বিস্ময়ে ক্রমাগত স্তব্ধ বিধুর
প্রথাগত স্ববিরোধ নিয়ে রিক্ত বসতি বিকল, আতুর
সন্মতি ছিল ত্যাগ কিম্বা অন্যতর বিনিময়ে ততোধিক
ফিরে গেছে তারা শ্রান্ত বিফল হতশ্বাস অচেনা পথিক
আবাদ হবে হয়তো পুনরায় উজাড় এ বিধ্বস্ত মশানে
আগাছার বুকে খেলে যাবে ঢেউ সৃষ্টির শ্রুতি কলতানে।

।। জীয়নমন্ত্র ।।

II জিতেশ ভট্টাচার্য II

বিসদৃশ আচরণ কোরো না
বিচরণভূমি মাতালের অধিকারে
স্বাধীন অবাধ রম্যক্রীড়াচ্ছলে
যদি পারো কখনো হয়ো স্বেচ্ছাসেবী
প্রতিদান আশাহীন বাঞ্ছাকল্পতরু
স্বচ্ছন্দ থাকে যেন গতায়াত চিরকাল
প্রচ্ছায়া, উপচ্ছায়ার সূক্ষ্ম ব্যবধানে
বুকে মহামারী দাবানল সুপ্ত পাবক
সংহারী মর্মবাণী গচ্ছিত সুগোপন
অশ্রুমেশা জলধারে বসন্ত-আক্ষেপ।

পৃথিবী ও প্রাণ (ফিরে দেখা)

II দেবাশিস ভট্টাচার্য II

এক

সে এক অন্য পৃথিবী। বিষাক্ত বায়ু তাকে ঘিরে রেখেছে।গর্ভে তার একতাল লাভা যেন ফুঁসছে। শূন্য থেকে ছিটকে আসা উল্কাপিণ্ড আছড়ে পড়ছে অবিরাম। থেকে থেকে তার জঠর ফুঁড়ে লাভা ও গ্যাস তীব্রবেগে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। সূর্য, যে ওই পৃথিবীর মতই নবীন, তার খর-দীপ্তি দিয়ে ঝলসে দিচ্ছে ছোট গ্রহটিকে। উত্তাল সমুদ্র আর কেঁপে কেঁপে ওঠা মেদিনীর মধ্যে যেন অবিরাম যুদ্ধ চলছে, সেইসঙ্গে দিনরাত আকাশ চিরে করাল বজ্রপাত।বাতাসের তীব্র বিষাক্ত গ্যাস বৃষ্টির সাথে মিশে ঝরে পড়ছে। নিঃসংশয়ে বলা যায় জলে স্থলে কথাও কোন প্রাণের চিহ্নমাত্র নেই।

উন্মত্ত সেই কুম্ভীপাকে আশ্চর্য ভাবে ধ্বংস হাতছানি দিল সৃষ্টিকে। বজ্রাঘাতে ভাঙতে জুড়তে থাকা অণু-পরমাণু থেকে সৃষ্টি হয়ে প্রাণের মৌল উপাদান, জৈব অণুগুলি রক্তবীজের মত ছড়িয়ে পড়ল জলে- স্থলে। কিন্তু পৃথিবীর বুকে সেই ভয়ঙ্কর পরিবেশে তাদের বিকাশ ছিল অসম্ভব। তাই সমুদ্রের গভীরে এক কোণে কয়েকটি অণু পাশাপাশি জুড়ে সৃষ্টি করল প্রথম জীব অথবা জীবাণু। শুরু হল জীবনের জয়যাত্রা।

শুধুই অণুর শৃঙ্খল, জীবকোষ তখনও গড়ে ওঠে নি। তবু জীবনের আদি প্রবৃত্তি অমোঘ লক্ষণ হয়ে দেখা দিল- এরা নিজেদের প্রতিলিপি তৈরি করে ছড়িয়ে যেতে থাকলো। উল্কাপাতের মাত্রা কমে আসায় সমুদ্রপৃষ্ঠে জীবাণু ছড়িয়ে যেতে থাকলো। ততদিনে জীবকোষ পূর্ণতার দিকে এগিয়ে গেছে, পরিপার্শ্ব থেকে প্রাণরস শুষে নেওয়ার প্রক্রিয়া কোষে শুরু হয়েছে। সেই প্রক্রিয়াতে কিছু জীবাণু অক্সিজেন নিঃসরন করত যা মাটিতে মিশে থাকতো। একসময় সেই অক্সিজেন বায়ুমণ্ডলে জমা হতে থাকে। পৃথিবীর বাতাস দ্রুত বদলাতে থাকে। প্রায় অদৃশ্য ওই জীবাণুরা এভাবে সূচনা করছিল এক নূতন পৃথিবীর।

সূর্যের আলোয় অক্সিজেন ভেঙ্গে তৈরি হয় ওজোন। বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে জমা হয়ে সেই ওজোন প্রতিহত করে সূর্যের মারাত্মক অবলোহিত রশ্মি, যা জীবকোষকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। নতুন বায়ুমণ্ডলের আচ্ছাদনে সমস্ত গ্রহ জুড়ে শুরু হল জীবনের প্রগতি। বহুকোষী প্রাণী সমস্ত দেহ পেতে নরম সূর্যালোক শুষে নিয়ে বেড়ে উঠতে লাগলো, সবুজে ছেয়ে গেল পৃথিবীর জলভাগ। জলে ভেসে বেড়ানো শ্যাওলা থেকে জঙ্গম প্রাণীর বিকাশ হল যারা জল কেটে দূর- দুরান্তে চলে যেতে পারে।

ততদিনে পৃথিবী অনেক ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে। বারবার পৃথিবীতে নেমে আসছে তুষারযুগ।অতল বরফের নীচে যুগ যুগ ধরে সুপ্ত থেকে হিম যুগের শেষে প্রতিবারই অদম্য প্রাণ জেগে ওঠে, এক থেকে বহু হয়ে ছড়িয়ে যায়।এমনই এক হিম যুগের শেষে জীবনের ইতিহাসে ঘটে যায় এক বিপ্লব।

জীবনের ইতিবৃত্ত খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীদের একমাত্র সম্বল ফসিল। জীবের বিকাশ সম্পূর্ণ হওয়ার আগে তাদের শরীরের কঠিন অংশ ছিল খুবই সামান্য, তাই বিজ্ঞানীদের ভরসা করতে হয়েছে পরোক্ষ চিহ্নে- যেমন পাথরের গায়ে রেখে যাওয়া অস্পষ্ট রেখায়। জীবনের ঊষাকালের ইতিহাস তাই অনেকটাই অনুমাননির্ভর। প্রায় সাতান্ন থেকে পঞ্চান্ন কোটি বছর আগের ভূস্তরের মধ্যেপাওয়া যায় বহু ফসিল যা বৈচিত্রে তার পূর্বসূরিদের তুলনায় একেবারে অভিনব। অর্থাৎ কোন অজ্ঞাত কারণে জীবজগতে ওই সময়ে আসে বৈপ্লবিক পরিবর্তন যাতে বহু নতুন নতুন জীবের উদ্ভব হয়। তারাই আজকের জীবজগতের বিভিন্ন শাখার পূর্বসূরি।কি করে জানা যায় সেই বংশলতিকা ?

জীবকোষ তার বিকাশের পথে রেখে গেছে এক মূল্যবান অভিজ্ঞান। কোষের কেন্দ্রে থাকে কিছু অণুর শৃঙ্খল, যাকে বলা যায় জীবনের পদাবলী। তাতে গাঁথা থাকে জীবটির পূর্ণাঙ্গ রূপের যাবতীয় তথ্য। প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মে সেই তথ্য সঞ্চারিত হয়ে চলে। আদিতম প্রাণ - গাছপালা জীবজন্তু আমাদের সবার যে বীজপুরুষ, তার কোষের থেকে আমার কোষে অযুত নিযুত যুগের সিঁড়ি বেয়ে আসা পদাবলীটি আজ শত শত মহাকাব্যের থেকেও বিপুলাকার, কিন্তু খুঁজলে তাতেও পাওয়া যায় আদি কবিতার শব্দ, পদ। সেই চিহ্ন ধরে জীবের বিবর্তনের একটি রূপরেখা তৈরি করে নেওয়া যায়।

পঞ্চান্ন-সাতান্ন কোটি বছর আগের সেই যুগেই জল থেকে স্থলে জীবের সঞ্চার হয়। প্রথমে উদ্ভিদ, পরে প্রাণী। যে পরাগ কোষ জলে ভেসে গিয়ে পরাগ মিলন ঘটাত তাই রেণুর আকারে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল। পৃথিবীর মাটির রুক্ষ ধুসরতা ঢেকে গেল শ্যামলিমায়। বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের পরিমান আরও বাড়ল। বায়ুমণ্ডলে জমা হতে লাগলো জলবাহী মেঘ, বৃষ্টি হযে যা নেমে আসতে লাগলো পৃথিবীর বুকে।


দুই

অনেক ধ্বংস, বিপর্যয়ের পথ পেরিয়ে কোন একটি সকালে এমন একটি দৃশ্য রচনা হোল-নীল আকাশের নীচে সমুদ্র, তটে আছড়ে পড়া ঢেউ, হাওয়ায় আন্দোলিত গাছপালা- এই গ্রহের প্রকৃতি সেজে উঠে যেন কার আগমনের প্রতীক্ষায় বসে। এই গ্রহের বুকে চলমান জীব তখন কিছু ক্রিমি ও কীট। নিতান্তই জৈবিক তাদের চেতনা- ক্ষুধা, আত্মরক্ষা ও বংশবিস্তার। খুবই সীমিত তাদের দৃষ্টি ও অনুভূতি; ক্ষুদ্রকায় তাদের মস্তিষ্ক। যেন প্রকৃতির রূপ বর্ণ গন্ধ শব্দ ধরা দেবে বলে দৈহিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত স্তরে একটু একটু করে বিকাশ হতে লাগলো তাদের মস্তিষ্কের।

এই বিকাশ নিরবচ্ছিন্ন হয় নি। মাঝে মাঝেই পৃথিবীর বুকে নেমে এসেছে ভয়ঙ্কর কোন না কোন দুর্যোগ, যাতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে অধিকাংশ প্রাণী ও উদ্ভিদ। তবু প্রাণের বীজ আবার, বারবার অঙ্কুরিত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। প্রাণের উত্তরাধিকার নিয়ে প্রতিবারই আশ্চর্য ভাবে রক্ষা পেয়ে গেছে কিছু প্রজাতি- যারা জীবনের ইতিহাসের নতুন অধ্যায় শুরু করেছে এই গ্রহে।

এভাবেই পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে কীটপতঙ্গের পালা শেষ হয়ে শুরু হয় সরীসৃপযুগ। জীবনধারণের সংগ্রামে টিকে থাকতে গিয়ে তাদের মস্তিষ্ক দ্রুত বিকশিত হয়ে ওঠে। আকৃতিতে বিশাল এই জীবদের মধ্যে তৃণভোজী ও মাংসাশী দুই প্রজাতিই আলাদা ভাবে বিকশিত হয়। মাংসাশী প্রাণীদের জটিল মস্তিষ্কের অন্যতম কাজ ছিল হিংস্রতাকে আরও শানিয়ে জলে স্থলে তাদের আধিপত্য কায়েম করা।পৃথিবীতে রক্তপাতের ইতিহাসের সেই শুরু।

গ্রহময় কোন ভয়ংকর বিপর্যয়ে সরীসৃপ যুগের ওপর যবনিকা নেমে আসে। তাদেরই একটি শাখা ডানায় ভর করে আকাশে পাড়ি জমিয়েছিল কোন এক প্রজন্মে।তারা বেঁচে যায়। পাখীর পূর্বপুরুষ এরা। আর বেঁচে যায় সরীসৃপদের আহার্য ক্ষুদ্রকায় কিছু স্তন্যপায়ী জীব।

ধ্বংসের বিভীষিকা পিছনে ফেলে পৃথিবীর বুকে জীবনের যাত্রা সাময়িক ব্যহত হলেও থেমে যায় না। ক্ষুদ্রকায় স্তন্যপায়ীদের শাখাপ্রশাখা ক্রমে অধিকার করে নেয় পৃথিবীর স্থলভাগ। মস্তিষ্কের বিকাশের ফলেএদের মধ্যে ক্ষুধা, হিংসা, ভয় এসবের বাইরে জন্ম নেয় আবেগ, উদ্বেগ, সন্তানস্নেহ। জৈবিক আকুতি আত্মরক্ষার সীমা অতিক্রম করে। স্বার্থের পরিসরকে বিস্তৃত করার এই ধারা সময়ের সাথে, প্রজাতির বিবর্তনের সাথে আরও প্রসারিত হতে থাকে। প্রবৃত্তির এমন উত্তরণ টিকে থাকার লড়াইতে স্তন্যপায়ী জীবদের সাহায্য করেছিল বলেই বিবর্তন একে আরও এগিয়ে নিয়ে যায়।

পৃথিবীর বুকে জীবের বিকাশের সম্পূর্ণ কাহিনীটি আমরা এখনও জানতে পারিনি। ফসিল ঘেঁটে জীবের শারীরিক বিকাশ নিয়ে হয়তো অনেক তথ্যই জানা যায়, কিন্তু মানসিক বা বৌদ্ধিক বিকাশের সুস্পষ্ট ছবি এখনও আমাদের অনায়ত্ত। মূলতঃ মাথার খুলির আয়তন থেকে ধারণা করা হয় কোন জীব কতটা বুদ্ধিমান ছিল। কিন্তু সেই বুদ্ধি কতটা বিকশিত ছিল অর্থাৎ ক্ষুন্নিবৃত্তি, আত্মরক্ষা, বংশবিস্তার - এসব আদিম চাহিদা মিটিয়ে আরও উন্নত স্তরের চিন্তাধারায় তারা সক্ষম ছিল কি না, তার কোন স্পষ্ট ধারণা পাওয়ার উপায় এই মুহূর্তে আমাদের জানা নেই। ভিন্ন ভিন্ন মনোবিজ্ঞানীরা ভিন্ন ভিন্ন তত্বের অবতারণা করেছেন, কিন্তু কোনটাই অসংবাদিত নয়। তাই হয়তো আমরা কখনই সঠিক জানতে পারব না, কোন জীবটির চেতনায় প্রথম এই উদার আকাশ আর শ্যামল ধরা, এই রূপ বদলাতে থাকা প্রকৃতি ছায়া ফেলেছিল; রাতের আকাশের তারা বয়ে এনেছিল রহস্যময় কোন অস্তিত্বের ইঙ্গিত।


তিন

স্তন্যপায়ীদের বিচরণ ছিল বৃক্ষের শাখায় শাখায়। একসময় এরা নেমে এল মাটিতে। হাতের ব্যবহার শুধু চলনে সীমিত না থাকায় তাদের জীবনধারণে বড় পরিবর্তন আসতে থাকে। গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনে সম্পর্ক পরিবারের বাইরেও বিস্তৃতি পায়, এই পরিস্থিতির সাথে তাল মেলাতে মস্তিস্ককে আরও বিকশিত হয়ে উঠতে হয়। জান্তব প্রবৃত্তির স্বার্থপরতা বা সন্তান স্নেহের আবেগকে অতিক্রম করে তার চিন্তার জগত বিস্তৃত হল সামাজিক পরিসরে – সে গোষ্ঠীর ভালোমন্দ নিয়ে ভাবতে শুরু করল। এই পর্যায়ে তার মস্তিষ্কের দ্রুত বিকাশ ঘটে। উন্মেষ হয় কল্পনাশক্তির; মন কাল্পনিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা আয়ত্ত করে।

জীবের আকারের সাথে সাথে মস্তিষ্কের আকার বৃদ্ধি পাবে- এতে অভিনব কিছু নেই। কিন্তু এই কপিকুলের মস্তিষ্কে ‘ইন্সুলার কর্টেক্স’ নামের একটি অঞ্চল দ্রুত বিকশিত হয়ে উঠে তাদের আচার আচরণে আমূল পরিবর্তন এনে দেয়। আকারে সর্ববৃহৎ না হলেও এদের মস্তিষ্ক অপেক্ষাকৃত জটিল চিন্তাভাবনার উৎস হয়ে ওঠে। বানর থেকে মানুষের বিবর্তনের পথে এই ইন্সুলার কর্টেক্সে নতুন নতুন অঞ্চলের উদ্ভব হয়েছে। সেই সঙ্গে জন্ম নিয়েছে সহানুভূতি, গোষ্ঠীচেতনা, আবেগ, হতাশা, বিশ্বাস, সন্দেহ, ভালোবাসা।
এম আর আই এর মত ইমেজিং এর নতুন সব পদ্ধতি আবিষ্কারের ফলে মানুষের মস্তিষ্ক নিয়ে গভীর অনুসন্ধান সম্ভব হয়েছে। মানুষের মনের কোন আবেগের সাথে তার মস্তিষ্কের কোন অংশ যুক্ত এসব তথ্য আজ অনেকটাই জানা গেছে। দেখা গেছে ইন্সুলার কর্টেক্স খুবই অদ্ভুত একটি অঙ্গ। সঙ্গীত, ভাস্কর্য- এসব নান্দনিক বোধের উৎস এই অঙ্গে, যা মানুষের চিন্তাকে পৌঁছে দেয় ঈশ্বরের দরজায়। আবার ঘৃণা, হতাশা, মাদকাসক্তিও জন্ম নেয় একই অঞ্চলে। এর ফলে তার সামনে যুগপৎ স্বর্গ ও নরক, দুয়ের দরজাই খুলে যায়।

হয়তো এই প্রথম, সৃষ্টির কোন জীবের মনে সৃষ্টিকে নিয়ে বিস্ময়বোধ ও মুগ্ধতার জন্ম নেয়। তার সূত্র ধরে আসে চারপাশের জগতকে নিয়ে প্রশ্ন আর তার উত্তরের সন্ধান।অনন্ত মহাকাশ তাকে ঘিরে রেখেছে মায়াজালের মত, তারার আলো সুদুরের সঙ্কেত নিয়ে তার কাছে পৌঁছয়। তার বিস্ময়ের দৃষ্টি প্রসারিত হয় মহাশূন্যের গভীরে। বিন্দুবৎ কিছু কণা যেন অপরিমেয়, অসীম জগতে তার স্থান খোঁজে। সেই সন্ধান আজও অব্যহত।

লক্ষাধিক বছরের তার ইতিহাসের অধিকাংশ অতিবাহিত হয় অনিশ্চিত প্রকৃতিকে বুঝতে আর তাকে জীবনসংগ্রামে সহায় করতে। কিন্তু তারপরের সংগ্রাম চলে তার নিজের মস্তিষ্কের মধ্যে- এক অংশের সাথে অন্য অংশের।

যেসব অনুন্নত জীব প্রবৃত্তির বশ তারা স্বার্থত্যাগ করতে পারে না, কিন্তু ক্ষুৎপিপাসা, কামের নিবৃত্তি হয়ে গেলে তারাও শান্ত হয়। প্রবৃত্তিকে দমন করা যার আয়ত্বে সে যেমন ক্ষুৎপিপাসা ভুলে থাকতে পারে তেমনি আবার পিপাসা মেটার পরেও আকণ্ঠ পান করে যেতে পারে। তাই তার লোভের কোন গণ্ডী থাকে না। ইন্সুলার কর্টেক্সে নিহিত আসক্তি শুধু নেশার দ্রব্য নয়, ঘৃণা ও বিদ্বেষকেও অবলম্বন করতে পারে। মানুষের ইতিহাসে তাই দুই বিপরীত মেরুর কাহিনী পুনরাবৃত হতে থাকে। আত্মজ, আত্মজন- এমনকি মানবজাতির জন্য সুখ- স্বার্থ ত্যাগ করে দুঃখকে বরণ করার ইতিবৃত্তের পাশাপাশি অর্থহীন ক্রুর হিংসায় নিজেরই প্রজাতিকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করার কাহিনী।

প্রাণের বিকাশের পর থেকে পৃথিবীর বুকে বার বার নেমে এসেছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়- প্রকৃতিদেবী যেন পরম মমতায় ছবি এঁকে হঠাৎ নিষ্ঠুর ভাবে সে ছবি মুছে দিয়েছেন বার বার।তবু প্রাণ ধ্বংস হয়ে যেতে যেতেও প্রবল জীবনতৃষ্ণা নিয়ে টিকে থেকেছে পৃথিবীর কোন এক কোণে- ভাবীকালে মাথা তুলে দাঁড়াবে বলে। আবার বিবর্তন, আবার বিকাশ এবং আবার নিয়তির মত সেই বিনাশ। বিকাশ আর ধ্বংসের চক্রাকার আবর্তনের পথে বিবর্তন এগিয়ে নিয়ে এসেছে জীবনকে কোটি কোটি বছরের পথ ধরে। মানুষের চেতনায় ধরা দিয়েছে তার চারপাশের অদ্ভুত সুন্দর রহস্যঘেরা তার বাসভূমি এই পৃথিবী।দেশ ও কালের সুদুরে তার দৃষ্টি সন্ধান দিয়েছে প্রকৃতির এক অচিন্তনীয় রূপের। এখনও কত বিচিত্র রহস্য তার চেতনায়, তার বোধিতে ধরা দেবে বলে অপেক্ষা করে আছে। প্রকৃতিদেবী কি মানুষকে সে সময়টুকু দেবেন?

এর থেকেও বড় প্রশ্ন হচ্ছে মানুষ কি মানুষকে, সেই সময়টুকু দেবে? পাশাপাশি দরজা দুটির মধ্যে স্বর্গের দরজাটি কোন প্রাচীন কালেই বন্ধ হয়ে গেছে, সর্বাঙ্গে তার মরচে। নরকের দরজাটি যখন তখন খুলে যাচ্ছে। তার ওপারে মানুষের সীমাহীন লোভের গহীন অন্ধকার ।

বন্ধ দরজা অলৌকিক ভাবে খুলে যাওয়ার মত যদি মানুষের সুবুদ্ধি তাকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচায়, তবে তার সাথে বেঁচে যাবে এই পৃথিবী, তার বায়ুমণ্ডল, তার চরাচরে ছড়িয়ে থাকা প্রাণ। সূর্য যতদিন আলো দিয়ে যাবে ততদিন।
অন্যথায় তার পরিবেশের সাথে মানুষও জীবাশ্ম হয়ে কালের গহ্বরে চলে যাবে। কিন্তু প্রাণ হয়তো এতো সহজে পৃথিবীর বুক থেকে মুছে যাবে না। সে কোন সুদুর অতীতে সুপারনোভার গর্ভে জন্ম নেওয়া অণু একত্র হয়ে তৈরি করেছে এই গ্রহ, রচনা করেছে এক থেকে বহু হওয়ার মন্ত্র। অর্বুদ-কোটি বছরের তার নিয়তি এক লহমায়মুছে যাওয়ার নয়। হয়তো গহন সমুদ্রের কোন কন্দরে লুকিয়ে থাকবে কিছু অণুর শৃঙ্খল- কোনো নতুন প্রভাতে প্রাণের পদাবলী নতুন করে রচনা করবে বলে।

(শেষ)

ফৈয়াজ খাঁ সাব কা মাজার



|| দেবাশিস ভট্টাচার্য ||

বঢ়োদরা অর্থাৎ বরোদা স্টেশনের বাইরে দাঁড়িয়ে আছি গাড়ির অপেক্ষায়। ভোর পাঁচটা, তবু তখনও আলো ফোটেনি। টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তার ওপারে নতুন পুরনো হোটেলের সারি। এর মধ্যে একটা হোটেল অনেকটা জায়গা জুড়ে, সর্বাঙ্গে তার প্রাচীনতার ছাপ। কাঠের রেলিং দেওয়া দোতলার বারান্দায় টিম টিম করে জ্বলছে হলুদ বাল্ব, সারি সারি রুম গুলোতে বোর্ডার আছে কি নেই বোঝা যাচ্ছে না। দরজাগুলো কোনো ঐতিহাসিক কালে নীল রঙের ছিল - তার কব্জাগুলোতে হয়তো মরচে ধরে গেছে। একসময়- যখন সয়াজি রাও গায়কোয়াড়ের বরোদার খ্যাতি সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়েছে আর তাতে আকৃষ্ট হয়ে ছুটে আসছেন দেশ বিদেশের জ্ঞানী গুণীরা- বহু ভাগ্যান্বেষী রাজানুগ্রহ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এই শহরে এসে এমনই কোন হোটেলে ঠাঁই নিত। তখন দুরপাল্লার বাহন বলতে ছিল রেলগাড়ি, তাই হোটেলগুলো সাধারণতঃ হতো স্টেশনের কাছেই। হয়তো তরুণ আব্দুল করিম খাঁ তার ভাই আব্দুল হককে নিয়ে অথবা যুবক ফৈয়াজ খাঁও ওইরকমই কোনো এক রুমে এসে উঠেছিলেন। হয়তো তাদের কড়ি বরগা দেয়াল সাক্ষী হয়ে আছে উদীয়মান ওস্তাদদের উদয়াস্ত সাধনার। ভাবলেই গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।

দীর্ঘদিন পর বরোদাতে আসা। তাই স্টাফ কলেজের, এখন যার নাম হয়েছে NAIR, হোস্টেলে যাওয়ার পথে স্মৃতির সাথে বর্তমানকে মিলিয়ে নিতে গিয়ে বারবার খেই হারিয়ে ফেলছিলাম। তবু রাজপ্রাসাদের সামনের রাস্তাটা একই রকম আছে, মাঝে মাঝে দু একটা বহুতল, দোকান, রেস্তোরাঁ বাদে। সিংহদ্বারের উল্টোদিকে রাস্তার ওপারে কিছু পুরনো মহল ভগ্নদশায় এখনও দাঁড়িয়ে আছে, কবে রিয়েল এস্টেটের কারবারিদের কব্জায় যাবে সেই প্রতীক্ষায়। রাজদরবারে অথবা রাজকীয় প্রতিষ্ঠানে যাঁদের বিশেষ স্থান ছিল, তাঁরা ছিলেন এইসব মহলের বাসিন্দা। হয়তো এরই কোন একটাতে ছিলেন আমাদের আলীসাহেব, সৈয়দ মুজতবা আলী।

বরোদার সেই স্বর্ণযুগের যারা ছিলেন হোতা, তাদের চিহ্ন যা কিছু রয়েছে, সব ওই প্রাসাদ সংলগ্ন ম্যুজিয়ামে। শুধু একজনই আমৃত্যু বরোদার মায়া কাটাতে পারেন নি, মৃত্যুর পর দফন হয়েছেন তাঁর যৌবনের উপবন, বার্ধক্যের বারানসীতে। তিনি ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ সাহেব।

শহরের কোন অঞ্চলে তাঁর মাজার, সেটা আমার জানা ছিল না। খানিকটা অনুসন্ধানের ফলে জানতে পারলাম, সেটা খাসওয়াড়ি মহল্লাতে, আরাধনা সিনেমার কাছে। এক ছুটির দিনে আরাধনা সিনেমার কাছে অটো থেকে নেমে খাসওয়াড়ির দিকে হাঁটা দিলাম। হাঁটতে হাঁটতে খাসওয়াড়ি পৌঁছে গেলাম, তবু মাজার দূরে থাক, কোন গোরস্থানই চোখে পড়লো না। উল্টোদিক ধরে আবার হাঁটতে হাঁটতে কিছুদুর আসার পর একটি মসজিদ চোখে পড়লো। গেট খোলা, নির্জন। ভেতরে ঢুকে 'জী কোই হ্যায়' হাঁক পাড়তে এক বৃদ্ধ উদয় হলেন, হাতে উর্দু কাগজ। 'য়ঁহা আসপাশ কহীঁ ফৈয়াজ খাঁ সাবকা মাজার হ্যায়?' বৃদ্ধের মাথা নাড়া আর চোখ মুখ দেখে বুঝতে পারলাম কস্মিন কালেও তিনি ওই নাম শোনেন নি। চলে যাচ্ছি যখন, বললেন, 'আগে চৌড়ায়া পে এক কব্রীস্তান হ্যায়, ওঁহা পাতা কর লিজিয়ে।' চৌমাথায় এসে ভালো করে দেখেও কিছু হদিশ করতে পারলাম না, অধিকাংশই মোটর পার্টসের দোকান। শেষ চেষ্টা হিসেবে একটি গ্যারেজের সামনের দোকানে এক যুবক চা খাচ্ছিল, তাকে জিজ্ঞেস করলাম। 'ফৈয়াজ খাঁ? গায়ক?' আহা! এ কী শুনলাম! আমার মাথানাড়ার প্রাবল্যে খানিকটা বিস্মিত যুবকটি গ্যারেজের পেছনের একটি মাঠ দেখাল। বলল- ওই দিকে একটি গেট আছে, আবার খানিকটা ঘুরে রাস্তার দিকেও একটি গেট আছে। কোনটা খোলা আছে বলতে পারবে না। দিশারীটিকে অশেষ ধন্যবাদ জানিয়ে গ্যারেজের পেছনের মাঠে গিয়ে দেখলাম উঁচু প্রাচীর ঘেরা একটা কিছু রয়েছে, কিন্তু গেট বন্ধ। অগত্যা রাস্তার দিকের গেটের সন্ধানে গেলাম। ওপরের সাইন বোর্ড দেখে জানলাম, সেটি শিয়া কব্রীস্তান। সে গেটও বন্ধ, কখন খোলে কেউ বলতে পারলো না। তবে গেটটি তেমন উঁচু নয়, তাই ভেতরে দেখা যায়। মাজার বলতে, কম্পাউন্ডের বাঁদিকের দেয়াল সংলগ্ন আচ্ছাদনের নীচে একটি কবর আর দুপাশে জাফরি কাটা দেয়াল। সেটিতেই শায়িত কণ্ঠ সঙ্গীতের শেষ সম্রাট।

ইচ্ছে ছিল তাঁর কবরে ফুল দেব, সে ইচ্ছে পূরণ হল না। বাইরে থেকেই প্রণাম জানালাম। জানিনা আজ আর কেউ ওই গেট খুলে তাঁর মাজারে মোমবাতি জ্বালিয়ে দেয় কিনা, সে সম্ভাবনা ক্ষীণ। গুজরাতে দাঙ্গার সময় কিছু নরাধম নাকি তাঁর মাজারে জ্বলন্ত টায়ার নিক্ষেপ করেছিল, তারা আমারই ধর্মের, তাই সেই লজ্জা নিয়েই মাথা নত করে রই। তিনি সঙ্গীত দিয়ে ঈশ্বরের চরণ স্পর্শ করেছেন, যদি স্বর্গ বা বেহেস্ত বলে কিছু থাকে, তাতে শরণ পেয়েছেন। ওই কলুষ তাঁকে তাই স্পর্শ করে না। যা কিছু অগৌরব, হতাশা, ক্ষতি তা আমাদের, তা আমার।

Tuesday, May 31, 2016

বচ্ছর দুই পরে

মুহূর্ত নিয়ে-
বেঁচে থাকা ভালো
প্রহর থেকে।
মুহুর্তের আনন্দ-উল্লাস
শোক-দুঃখ
প্রহরে স্মৃতি হয়ে যায়। 

এসো, আজ বসে মুহূর্ত গুনি-
কত মুহুর্তে প্রহর হয় ?
না, এখন আর তা
কেউ গোনে না।

বিগত দুই বছর
অনেক মুহুর্তের
কাটাকুটি খেলার ফল।
কেউ কোনাকোনি রেখা
টানতে পারে নি।

Friday, April 29, 2016

অগ্নি মশাল

অগ্নি মশাল জ্বালো জাতীয়তাবাদী
অগ্নি মশাল জ্বালো।
এ নয় জোনাকির,  এ নয় মোমের আলো।
এই সময়, এই মুহুর্ত নিয়ে এলো
নব আশার আলো।  আধার আর নয় যে কালো।
অগ্নি মশাল জ্বালো জাতীয়তাবাদী
অগ্নি মশাল জ্বালো।

এ যে  কালো রাত্রির পর উজ্জ্বল ভোরের আলো।
হেরে যাওয়া নুব্জ জাতির বুকে নব শিহরণ আনো ।
অগ্নি মশাল জ্বালো জাতীয়তাবাদী
অগ্নি মশাল জ্বালো। 

Tuesday, March 22, 2016

ভাঙ্গা গড়া

।। শমীক চৌধুরী ।।

এ কোন ধ্বংসস্তুপ সারিয়ে
গড়ে তুলছো তুমি অট্টালিকা
জানো না ? এই ধ্বংসস্তুপ
এর আগে বিশাল এক -
অট্টালিকা ছিল।


চেয়ে দেখো ভালো করে
প্রত্যেকটি ইট সুরকির
গায়ে ধ্বংস তার স্বাক্ষর
রেখে গেছে।

Tuesday, January 12, 2016

নিওন বাতি, বাদুড় আর সুচের ডগার মাটি

আজ ও শহরের নিওন বাতির উপরকার অন্ধকারে
বিশালকায় বাদুড় পাখা মেলে।
দূরে থেকে কাছে শো শো শব্দে পাক খায়-
শীতের রাতে আরো ঠান্ডা হওয়া ছড়িয়ে দেয়।

সুচের ডগার উপর কার মাটির দখল নিয়ে
কুরুক্ষেত্র হচ্ছে হরদম লঘু থেকে গুরুতর

নিওন  বাতির উপরকার বাদুড়েরা  পাক খায়
আর   ছড়িয়ে দিয়ে যায়   ঠান্ডা হওয়া...