Translate

Showing posts with label Article. Show all posts
Showing posts with label Article. Show all posts

Tuesday, August 23, 2016

সেলেরিটাস

|| দেবাশিস ভট্টাচার্য ||


এক বিজ্ঞানী ও তাঁর সহকারী। রাতের অন্ধকারে এসে দাঁড়ালেন উন্মুক্ত প্রান্তরে। দুজনেরই হাতে লন্ঠন, যেটার কাঁচের ওপরের ঢাকনা দ্রুত খোলা বা বন্ধ করা যায়।তাঁদের মধ্যে কথা হল যে, বিজ্ঞানী একমাইল দুরের টিলার ওপর দাঁড়িয়ে তাঁর লন্ঠনের ঢাকনা খুলবেন। সহকারী সেই আলো দেখতে পেলে তাঁর হাতের লন্ঠনের ঢাকনাটা খুলবেন।

আসলে বিজ্ঞানীটি মাপতে চলেছিলেন আলোর গতিবেগ।যেটা এতকাল অসীম বলেই ধরে এসেছে সবাই। কিন্তু তিনি যেহেতু গ্যালিলিও, প্রমাণ ছাড়া সেটা মেনে নেন কি করে?

কিন্তু সে যাত্রায় গ্যালিলিওকে নিরাশ হতে হল। আজ আমরা জানি, এক মাইল পথ আসা যাওয়া করতে আলো সময় নেয় সেকেন্ডের একলক্ষ ভাগের একভাগ প্রায়। ওই ক্ষিপ্রতার সঙ্গে পাল্লা দেওয়া মানুষের কর্ম নয়, তাই গ্যালিলিওর কাছে অসীম ধরা দিল না।তবে ওই অসীমের ব্যাপারটাতেও তিনি নিঃসন্দিহান হতে পারলেন না।

এর কয়েক দশক পরে ১৬৭৬ সালে ডেনমার্কের বিজ্ঞানী রোমার দূরবীনে বৃহস্পতির উপগ্রহ আইওর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। বৃহস্পতির চারদিকে পাক খেতে খেতে আইও গ্রহের পিছনে ঢাকা পরে গেলে তার গ্রহণ হয়, রোমার দেখলেন গ্রহণ একই সময়ে হচ্ছে না। বৃহস্পতি যখন পৃথিবীর একেবারে কাছে, তখন গ্রহণের সময় এগিয়ে যাচ্ছে। রাতের আকাশে যখন বৃহস্পতি পৃথিবীর থেকে সবচাইতে দূরে, তখন গ্রহণের সময় প্রায় দশ মিনিট পিছিয়ে যাচ্ছে। এর একটাই ব্যাখা সম্ভব- যখন বৃহস্পতি ও আইও বেশী দূরে, আইও থেকে প্রতিফলিত আলো পৃথিবীতে আসতে বেশী সময় নিচ্ছে। আলোর গতি প্রচণ্ড বেশী হলেও যে তা সীমিত, তার প্রমাণ হাতেনাতে পাওয়া গেল।

কিন্তু সেই গতিবেগ কত? রোমারের সময় পৃথিবী থেকে সূর্যের দুরত্ব জানা ছিল না। তাই সেই গতির হিসেব করা গেল না। প্রায় পঞ্চাশ বছর পরে ইংরেজ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ব্রাডলি দেখলেন, রাতের আকাশে একটা বিশেষ সময়ে কোন একটি তারার অবস্থান একই থাকছে না। পৃথিবী তার কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে তার বেগ বাড়ে কমে - যখন সূর্যের কাছে, তখন তার বেগ বেশী, দূরে গেলে কম। পৃথিবীর বেগের সাথে সাথে তারাদের অবস্থানে সূক্ষ্ম পরিবর্তন হচ্ছে। একে বলে Stellar aberration । তিনি অঙ্ক কষে দেখলেন এই পরিবর্তনের মান পৃথিবীর গতি আর আলোর গতির আনুপাতিক হওয়া উচিত। পৃথিবীর গতি যেহেতু জানা ছিল, ব্রাডলি মানব ইতিহাসে প্রথম আলোর গতির পরিমাপ করতে পারলেন- তিন লক্ষ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড।

ব্রাডলির পর কেটে গেছে প্রায় তিনটি শতাব্দী। এখন আমরা একদিকে যেমন পেয়েছি লেজার রশ্মি তেমনি হাতে পেয়েছি নিমেষ- মুহূর্ত মাপার মত সূক্ষ ঘড়ি। এসব নিয়ে মাপজোখ করে আলোর গতির যে সর্বাধুনিক পরিমাপ পাওয়া গেছে, সেটা হচ্ছে প্রতি সেকেন্ডে ২৯,৯৭,৯২, ৪৫৮ মিটার। অর্থাৎ ২.৯৯ লক্ষ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড। তিনশো বছর আগের ব্রাডলি সাহেবের পর্যবেক্ষণের তারিফ না করে উপায় নেই!

আলোর গতি আমাদের সবার কাছে C চিহ্নে পরিচিত। এই C এসেছে লাতিন Celeritas থেকে। যার অর্থ ক্ষিপ্রতা। আজ আমরা জানি, ক্ষিপ্রতার পরাকাষ্ঠা আলোর গতি। কোনো পদার্থ বা শক্তি এর থেকে বেশী বেগে ছুটতে পারে না।

বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কিছু গভীর সত্য এই C এর সাথে জড়িয়ে আছে। গত দুশো বছর ধরে পরতে পরতে তার উন্মোচনের মধ্যে ধরা আছে বিজ্ঞানের জয়যাত্রার কাহিনী। সবটা বলতে গেলে সাতকাহন, তাই সে চেষ্টা না করে একটা বা দুটো ঘটনা নিয়ে লিখব পরের পর্বে।


                                                            (২)


ইলেকট্রিক চার্জের পরিভাষা হচ্ছে বৈদ্যুতিক আধান। কিন্তু আজকাল কেউ বলে না , ‘আমার মোবাইলটাকে আধানিত করতে হবে’। তাই ক্ষেত্রবিশেষে পরিভাষার প্রয়োগ পরিহার করলে আশা করি মার্জনা করবেন।

অষ্টাদশ শতকে ফরাসী বৈজ্ঞানিক কুলম্ব দুটি চার্জের মধ্যে যে বল কাজ করে, তার সূত্র আবিষ্কার করেন। তিনি দেখালেন ওই বল চার্জ দুটির মাপ ও তাদের মধ্যের দুরত্বের ওপর নির্ভর করে।আরও সঠিকভাবে বললে, চার্জ দুটির মাপের গুণফল যত বেশী হবে, তত জোরে তারা একে অপরকে টানবে বা ঠেলে দেবে; দুরত্ব যত বেশী হবে, তার বর্গের অনুপাতে আকর্ষণ বা বিকর্ষণ দুর্বল হবে।
নিউটন মহাকর্ষ বলেরও একই সূত্র দিয়েছিলেন- তফাৎ শুধু এই যে মহাকর্ষের বল চার্জের বদলে বস্তুর ভরের ওপর নির্ভরশীল। এই যে সমাপতন সেটা কি নেহাত কাকতালীয় নাকি প্রকৃতির কোনো গভীর সত্য এতে লুকিয়ে আছে? এখনও আমরা জানি না।

মহাকর্ষের বল হিসেব করতে একটা ধ্রুবক চলে আসে, যাকে আমরা বলি মহাকর্ষীয় ধ্রুবক। ঠিক তেমনি শূন্যে থাকা দুটি চার্জের মধ্যের বল বার করতে একটা ধ্রুবক চলে আসে, যেটাকে গ্রীক অক্ষর এপ্সিলন দিয়ে চিহ্নিত করা হয়। দুটি চৌম্বক মেরুর মধ্যে যে বল কাজ করে তার সূত্রও একই ধরণের, সেখানে যে ধ্রুবকটি নিতে হয় তার চিহ্ন গ্রীক অক্ষর মিউ।

আঠেরোর শতকে ইউরোপে মাইকেল ফ্যারাডে, কার্ল গাউস, আঁদ্রে এম্পিয়ার, হেইনরিখ লেঞ্জদের মত দিকপাল পদার্থবিদরা বিদ্যুৎ ও চুম্বকীয় বল নিয়ে নতুন নতুন পরীক্ষা নিরীক্ষা ও তত্ত্ব প্রকাশ করছিলেন। এঁদের মধ্যেই একজন, জার্মান বিজ্ঞানী গুস্তাভ কির্খফ (আমাদের দেশের স্কুলকলেজে পড়ুয়ারা এঁকে কির্সফ নামে জানেন, সেটা ঠিক হলেও হতে পারে)এপ্সিলন আর মিউএর মান নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলেন।তাঁরই নজরে এল ব্যাপারটা। মিউ আর এপ্সিলনের গুণফলের যদি বর্গমূল করা হয়, সেটাকে উল্টে দিলে পাওয়া যাচ্ছে আলোর গতি C , ঠিক যেমন ১/২ এর উল্টো বা রেসিপ্রোকাল হচ্ছে ২, ২ এর উল্টো ১/২। নেহাতই কাকতালীয়? না এদের মধ্যে কোনো গভীর সম্বন্ধ রয়েছে?

স্কটল্যান্ডের পদার্থবিদ জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল ওই শতকের ষাটের দশকে লন্ডনের কিংস কলেজে অধ্যাপক ছিলেন। ততদিনে এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে বিদ্যুৎ বা তড়িৎক্ষেত্র আর চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তড়িৎক্ষেত্রে দ্রুত পরিবর্তন জন্ম দেয় চৌম্বক ক্ষেত্রের আবার চৌম্বক ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটলে তার চারদিকে তড়িৎ ক্ষেত্রের সৃষ্টি হয়। এই সম্পর্কগুলোকে ম্যাক্সওয়েল চারটি সমীকরণে প্রকাশ করলেন। তাদের একটির সাথে অন্যটিকে গেঁথে তিনি পেলেন একটি মাত্র সমীকরণ। সেটা একটা ধাবমান তরঙ্গের সমীকরণ, তার এগিয়ে চলার গতি হচ্ছে মিউ আর এপ্সিলনের গুণফলের বর্গমূলের রেসিপ্রোকাল। অর্থাৎ সেই C ।আক্ষরিক অর্থেই হাতে কলমে প্রমাণ হয়ে গেল আলো আসলে তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ।

আমাদের মোবাইল ফোনের ‘সিগন্যাল’, রেডিওতরঙ্গ, মাইক্রোওয়েভ, এক্সরে, তেজস্ক্রিয় রশ্মি গামারে- এসবই তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ। অর্থাৎ একই প্রজাতি, শুধু বর্ণের ভেদ। হ্যাঁ, আক্ষরিক অর্থে বর্ণই। নানা রঙের আলোর প্রভেদ তাদের কম্পাঙ্কে, ওই কম্পাঙ্কই আলাদা করে রেডিও তরঙ্গ থেকে এক্সরেকে। সূর্যের তাপ পৃথিবীতে সেই তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গের আকারেই এসে পৌঁছয়। রেডিওর এরিয়ালে একইসাথে এসে পড়ছে রেডিও তরঙ্গ, মোবাইলের সিগন্যাল, সূর্যের আলো।এদের একেকটা এক এক কম্পাঙ্কের। তাদের মধ্যে রেডিওর তরঙ্গই শুধু সেই এরিয়ালে ধরা পড়ে, ঠিক যেমন আমাদের চোখে ধরা পড়ে শুধু আলো। প্রকৃতি আমাদের চোখের ভেতরের এন্টেনাগুলো ওই মাপেই বানিয়েছেন কি না!

রেডিও তরঙ্গের উৎস রেডিওস্টেশনের ট্রান্সমিটার, মোবাইল সিগন্যালের উৎস টাওয়ারের নীচে থাকা যন্ত্রপাতি, তাহলে আলোর উৎস কি? এই প্রশ্নের উত্তর প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই মানুষ জানে। আগুণ জ্বাললেই আলো। কিন্তু এতে কোথায়ই বা তড়িৎ, কোথায় চুম্বক? এর উত্তর ম্যাক্সওয়েলের সময়েও জানা ছিল না। তারজন্য বিজ্ঞানকে অপেক্ষা করতে হল পরের শতাব্দী অবধি, যখন ইলেকট্রন, প্রোটন আর পরমাণুর গঠন নিয়ে নতুন নতুন তথ্য হাতে আসতে লাগলো।জানা গেল, পরমাণুতে প্রোটনের টানে বাঁধা পড়া ইলেকট্রন থেকেই বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে বেরিয়ে আসে এই বিদ্যুৎচুম্বকীয় তরঙ্গ আলোর রূপ ধরে। তা সে জোনাকির আলোই হোক আর মোবাইল বা ল্যাপটপের এলইডি স্ক্রীন হোক।

আলোর গতি C দেখা গেল স্রেফ দুটো ধ্রুবকের মানের ওপর নির্ভরশীল। আলোর উৎসের গতি বা যে দেখছে তার গতির সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। এই সাধারণ সত্যটার মধ্যে যে কত অসাধারণ তাৎপর্য লুকিয়ে আছে, একশো বছর ধরে সেটা কারও চিন্তায় ধরা দেয় নি।যখন ধরা পড়ল, পদার্থবিদ্যার জগতটাই ওলটপালট হয়ে গেল। পরের পর্বে তার কথা।



                                                                  (৩)


উনিশ শতকে নতুন নতুন আবিষ্কার বিজ্ঞানের জগতটাকে দ্রুত পাল্টে দিচ্ছিল। সাধারণ মানুষ, যারা বিজ্ঞান নিয়ে চর্চা করেন না, তাদের জন্য আরন বার্ন্সটাইন নামে এক জার্মান ইহুদী বিজ্ঞানী ১৮৮০ সালে ‘পপুলার বুক অফ ন্যাচারাল সাইন্সেস’ – এই নাম দিয়ে কয়েক খণ্ডে বই প্রকাশ করেন। তাঁর বইগুলো এতোটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষায় তার অনুবাদ প্রকাশিত হয়। কিশোরমনের কল্পনাকে উস্কে দেওয়া এমন বই যে কতশত মন আর চোখ খুলে দেয়, তার কোনো খোঁজ কেউ রাখে না।

এমনই এক কিশোর আপন খেয়ালে ইতালির গ্রামের মেঠো রাস্তায় সাইকেল চেপে ঘুরে বেড়ায়। পারিবারিক ব্যাবসায় বিপর্যয়ের মুখে পড়ে তার বাবা সপরিবারে জার্মানির মিউনিখ থেকে ইতালিতে চলে এসেছেন। ছেলের পড়াশোনায় যাতে ব্যাঘাত না ঘটে তাই তিনি ছেলেকে মিউনিখে রেখে এসেছিলেন। কিন্তু ওই স্কুলের পড়ানোর ধরণধারণ ছেলেটির একেবারেই পোষাচ্ছিল না। এই নিয়ে শিক্ষকদের সাথে বাদানুবাদ হওয়ায় তাকে স্কুল ছাড়তে হয়। নেহাতই সাধারণ মানের এক ছাত্রের এহেন ঔদ্ধত্ব শিক্ষকরা মেনে নেবেন না বলাই বাহুল্য। কিশোরটি চলে আসে ইতালিতে, তার বাবা মার কাছে।
স্কুলের পাঠ্য বিষয়গুলোর মধ্যে অঙ্ক আর পদার্থবিদ্যা ছেলেটির খুব মনে ধরেছিল। এরমধ্যেই বার্ন্সটাইনের বই তার পড়া হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ আর আলোর অকল্পনীয় দ্রুতগতির ব্যাপারটা তার মাথা থেকে যেন নামতেই চাইছিলনা। সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিয়ে সে ভাবতো, কেমন হয়, যদি সাইকেলকে ছুটিয়ে দেওয়া যায় জোরে, আরও জোরে, আলোর গতির সীমানায়......।ঠিক যেন ঢেউএর পিঠে সওয়ার হয়ে ছুটে যাওয়া। কিন্তু আলোর বেলায় এমন পরিস্থিতিতে তো গোটা ব্যাপারটাই কেমন যেন গোলমেলে হয়ে যাবে! আলোর তড়িৎক্ষেত্র আর চৌম্বকক্ষেত্র হয়ে যাবে স্থাণু- তাহলে আলোরই তো অস্তিত্ব থাকবে না!

কিশোর এ্যালবার্ট ভেবে ভেবে তল পায় না। আলোর গতিকে ছোঁয়া দূরে থাক, তার কাছাকাছি পৌঁছলেও এমন ভূতুরে সব ব্যাপারস্যাপার ঘটে যাওয়ার কথা, বাস্তব অভিজ্ঞতার সাথে যা একেবারেই সামঞ্জস্যহীন।

ধরুন আপনি দুটি বাচ্চা ছেলের কাছে দাঁড়িয়ে তাদের বল ছোঁড়াছুড়ি দেখছেন। দূরে থাকা ছেলেটি বল ছুঁড়ে দিচ্ছে, আপনার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটি সেটা লুফে নিচ্ছে। এবার যদি আমরা ধরে নিই যে কখনও কোনো পরিস্থিতিতে বলের গতি আলোর গতির থেকে বেশী হয়, তবে আপনি কি দেখবেন? দূরের ছেলেটির বল ছোঁড়ার দৃশ্যটি আপনার চোখে এসে পৌঁছনোর আগেই আপনি দেখবেন কাছের ছেলেটি বল লুফে নিচ্ছে। অর্থাৎ কার্যকারণ সম্পর্ক বলে কিছু থাকবে না।

বছর গড়িয়ে যেতে এ্যালবার্ট ভর্তি হল জুরিখের একটি পলিটেকনিকে।অঙ্ক ও পদার্থবিদ্যায় শিক্ষকদের নজর কাড়লেও চার বছর বাদে স্নাতক হওয়ার পর শিক্ষকের চাকরী জোটাতে পারল না। দুবছর বিফল চেষ্টার পর পেটেন্ট অফিসেই ঢুকে পড়ল যুবক এ্যালবার্ট আইনস্টাইন।

প্রেম, বিয়ে, সংসার- নানা ঘটনায় দ্রুত ঘুরে যায় কয়েকটি বছর। সময় পেলেই আইনস্টাইন আলোর গতি ও গতিবিদ্যা নিয়ে মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকা প্রশ্নগুলো নিয়ে বসে পড়েন। ১৯০৫ সালে তাঁর যুগান্তকারী গবেষণাপত্র প্রকাশ পেল- যার শিরোনাম, ইংরাজি তর্জমায়, ‘On electrodynamics of moving bodies’.

গোড়াতেই আইনস্টাইন দুটি স্বীকার্য বা ‘Postulate’ মেনে নেন- ১) আলোর গতি উৎসের গতি- নিরপেক্ষ। মাটিতে দাঁড়িয়ে বন্দুক ছুঁড়লে গুলিটি যে গতি পাবে, একটি এরোপ্লেনে বসে গন্তব্যের দিকে গুলি ছুঁড়লে তার গতি হবে অনেক বেশী , কিন্তু আলোর বেলায় সেটি হবার যো নেই। টর্চ, সে প্লেনের যাত্রীর হাতেই থাক, আর মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকের হাতেই থাক, সেটা জ্বাললে তার থেকে বেরোনো আলো একই গতি নিয়ে ছুটে যাবে। ২) পদার্থবিদ্যার নিয়ম সর্বত্র এক, তা সে স্থির মাটির ওপরে হোক অথবা সুষম গতিতে যেতে থাকা কোনো গাড়িতে হোক। স্রেফ যুক্তি খাটিয়ে আর সহজবোধ্য অঙ্ক দিয়ে আইনস্টাইন দেখিয়ে দিলেন, যে কোনো সুষম গতিতে যেতে থাকা একটি গাড়িতে বসে কেউ কোনো একটি জিনিষের যে দৈর্ঘ, ভর বা ঘড়িতে যে সময় মাপবে, সেটি স্থির অবস্থায় মাপা একই জিনিষের দৈর্ঘ ও ভর বা একই ঘড়িতে মাপা সময় থেকে আলাদা। কিন্তু আমাদের সাধারণ অভিজ্ঞতা তো তা বলছে না! আসলে ফারাকটা এতোটাই সূক্ষ্ম যে আমাদের কাছে সেটা ধরা পড়ে না। তাই আইনস্টাইন নিউটনের বলবিদ্যাকে ভুল প্রমাণ করলেও ভ্রান্তির পরিমাণ এতোটাই কম যে আমাদের রোজকার কাজে আমরা চোখ বুজেই নিউটনের মেকানিক্স প্রয়োগ করতে পারি।

যখনই কোনো জিনিষের গতি আলোর গতির কাছাকাছি হয়ে যাবে, তখন নিউটনের নিয়ম আর খাটবে না, তখন আইনস্টাইন সহায়- যেমন পরীক্ষাগারে মৌল কণাদের গতি বা পরমাণুতে ইলেকট্রনের গতি।

আইনস্টাইনের এই ‘বিশেষ আপাক্ষিকতা’ আরেকটি গভীর সত্যকে উদ্ঘাটন করে- সেটা হল যে ভর ও শক্তি একই জিনিষের এপিঠ- ওপিঠ। ভরকে আলোর গতির বর্গ দিয়ে গুণ করলে শক্তির পরিমাণ পাওয়া যায়। এই অতি সরল সত্যটির তাৎপর্য অসীম। একাধারে সুন্দর ও ভয়ংকর। সেটা আজ কারো অজানা নেই।

আলোর গতি উৎসের গতির ওপর নির্ভর না করলেও মাধ্যমের ওপর নির্ভর করে। কারণ আপাতদৃষ্টিতে খুবই সরল; ওই যে মিউ আর এপ্সিলনের কথা বলেছিলাম, তাদের মান এক এক মাধ্যমে একেক রকম। জলে বা কাঁচে আলোর গতিবেগ শূন্যে তার গতিবেগ থেকে কম- আলোর প্রতিসরণের কারণ এটাই। চৌবাচ্চা বা সুইমিং পুলের গভীরতা তাই বাইরে থেকে অনেকটাই কম বলে মনে হয়। আলোর প্রতিসরণের ফলেই বাইরের জগতের ছবি আমাদের অক্ষিপটে পড়ে। হীরের চোখ ধাঁধানো দ্যুতির কারণও এই প্রতিসরণ বা অন্যভাবে বললে, বিভিন্ন মাধ্যমে আলোর বেগের তারতম্য।
আবার আলোর গতি তার রঙের ওপরও নির্ভর করে। রামধনুর রঙের বাহার ওই জন্যই।

এই পর্যায় শেষ করার আগে দুটি মজার ব্যাপার উল্লেখ করছি। আলোর গতি নিয়ে একটি রসিকতা আইনস্টাইনের উক্তি বলে প্রচলিত আছে, সেটা এরকম-‘ We all know that light travels faster than sound. That’s why certain people appear bright until you hear them speak.”

দ্বিতীয়টি একটি ইংরেজি লিমেরিক, রচয়িতা অজ্ঞাত-
“ There was a young lady named Bright
Whose speed was far faster than light;
She set out one day
In a relative way
And returned on the previous night; “
-------------------------------------------------------------------------

Saturday, July 16, 2016

মানবিক ???

জিতেশ ভট্টাচার্য
=========
মানুষ প্রকৃতপক্ষে একটি শ্রান্তিহীন লড়াকু প্রজাতি এবং লড়াই, হানাহানি ছাড়া সে জীবনধারণ করিতে পারে না। এই যুযুধান প্রবৃত্তি তাহার মজ্জাগত এবং জীবনশৈলীর এক অম্লজানসদৃশ উপাদান। কোন ধর্ম বা দর্শন যেমন আমাদের দেহের কোষবিভাজন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন সাধন করিতে পারে না, তেমনি পারে না এই প্রবৃত্তি দূর করিতে।হিন্দু-মুসলমান, শিয়া-সুন্নি, শাক্ত-শৈব, বাউল-সুফি, বাঙালী-অবাঙালী, ভারতীয়-বাংলাদেশী, রবীন্দ্রপ্রেমী-নজরুলপ্রেমী, মোহনবাগান-ইষ্টবেঙ্গল, সেক্যুলার-কম্যুন্যাল,আমিষভোজী-নিরামিষাশী, কবি-অকবি, খেয়ালগায়ক-‘র‍্যাপ’গায়ক জাতীয় বহুবিধ বিষয় লইয়া তাহারা অবিরাম লড়িতেছে। একদল যদি ‘ইসলামিক’ সন্ত্রাসবাদের ধুয়া তুলে, ত অন্যদল ‘খাপ’ পঞ্চায়েত টানিয়া আনে এবং অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে একে অপরের বাপান্ত করিতে থাকে। আপন আপন তথাকথিত ‘ধর্ম’ হইতে সমর্থনসূচক ভুরি ভুরি উদ্ধৃতি লইয়া তাহারা প্রমাণ করিতে চাহে যে এই মহাবিশ্বে তাহারাই মানবতার একমাত্র ঠিকাদার এবং বাকী সকলেই শয়তানের চর। যেহেতু আমরা সকলেই ব্যাপক 'গণতন্ত্রপ্রেমী', তাই প্রত্যেকেরই অধিকার আছে নিজ বক্তব্য পেশ করিবার এবং বোধকরি হিংস্র পদ্ধতিতে যাহাকে বলে ‘হট্‌ পারস্যুইট্‌’, তাহা চালাইবার। এমতাবস্থায়, মাৎস্যন্যায়ের এই চিরস্থায়ী ‘সংস্কৃতি’তে শান্তিপ্রিয় সংখ্যালঘু জনতা কি আর করিতে পারে! তাহারা দিনগত পাপক্ষয় করিতে করিতে লড়াকু সম্প্রদায়সমূহের কোন একটির বলি হইবার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করিতে থাকে এবং এই উত্তপ্ত চাটু হইতে উদ্ধারকারী দৈবিক শক্তির হস্তক্ষেপের আশা নামক মরীচিকার কল্পনায় জীবনযাত্রাকে অণুপরিমাণ হইলেও সহনীয় করিবার প্রয়াসী হয়। আবার কেহ কেহ সাময়িক নিরাপত্তা অথবা প্রাণের তাগিদে আন্তরিক তাড়নার বিপরীতে গিয়াও কোন একপক্ষে নাম লিখাইতে বাধ্য হয় এবং নিজের আত্মাটিকে অন্যবিধ এক পীড়ণের বলি চড়ায়।

স্রষ্টার অভিপ্রায়


II দেবাশিস ভট্টাচার্য II

রাতের আকাশে ফুটে থাকা গ্রহ তারার দিকে তাকিয়ে কখনও কি আমাদের মনে হয় যে ব্রহ্মাণ্ডের অপর প্রান্তে ঠিক সেইসময় কোন জীব ঠিক ওইভাবেই অবাক বিস্ময়ে তার আকাশকে দেখছে? হয়তো তার আকাশ আমাদের আকাশ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে হয়তো কোন ছায়াপথ নেই, আছে আকাশ জুড়ে রঙ বেরঙের বিচিত্র নকশা। হয়তো তার আকাশে একাধিক চাঁদ, তার মধ্যে কোনটা হয়তো আকারে আমাদের চাঁদের থেকে অনেক বড়। সেই জীবটির মনে মহাবিশ্বের ছায়া যে ভাব জাগায় তা আমাদের মনের অবাক বিস্ময়ের থেকে কতটুকু আলাদা? চাঁদের শরীর থেকে ঠিকরে আসা আলোয় যখন তার চারপাশ উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে, তার মনে কি প্রতিক্রিয়া হয়? সেটাকে কি আমাদের আনন্দের সমগোত্রীয় কিছু বলা চলে?


রবীন্দ্রনাথ বলেছেন স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টিকে আমাদের চোখ দিয়েই অবলোকন করেন। তিনি আসলে উপনিষদের কথাটাকেই অন্য ব্যঞ্জনা দিয়েছেন- ‘তৎ ত্বম অসি’। কিন্তু অতিকায় এই ব্রহ্মাণ্ডের এক কোণে ক্ষুদ্র বালুকণার মত কোন একটি গ্রহের একটি বিশেষ জীবকেই তিনি কেন বেছে নেবেন? তাঁর অহৈতুকী এই কৃপা যেন অবিশ্বাস্য মনে হয়।

জীবনের বিকাশের জন্য যা যা প্রয়োজন, তেমন সব আয়োজন ব্রহ্মাণ্ডে বহু গ্রহেই আছে – এই নিয়ে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত। তাদের মধ্যে উন্নত কোন জীবের বাসভূমি হয়ে ওঠার সম্ভাবনাময় গ্রহের সংখ্যাও কম নয়। স্রষ্টা তাই সম্ভবতঃ সহস্র চক্ষু দিয়ে তাঁর সৃষ্টিকে দেখছেন- ‘সহস্রশীর্ষাপুরুষঃ সহস্রাক্ষঃ সহস্রপাদ’। মানুষের ক্ষেত্রে দুই চোখের দৃশ্যপট তার মস্তিষ্কে গিয়ে মিলেমিশে বোধে ধরা দেয়। সৃষ্টির দুই প্রান্তে থাকা দুটি জীবের অনুভূতি কখনও একে অপরের ছোঁয়া পাবে না। তবে কি তারা সর্বব্যাপী কোনো চেতনার বা ধীশক্তির অঙ্গ? যাকে গায়ত্রীমন্ত্রে স্মরণ করা হয়-‘ ভর্গো দেবস্য ধীমহি ধিয়ঃ যো নঃ প্রচোদয়াৎ’? কী অভিনব কল্পনা! তাঁরই প্রেরণ করা ধীশক্তি দিয়ে তাঁর জ্যোতির্ময় রূপকে কল্পনা করি- ভূঃ ভূবঃ স্বঃ তৎ সবিতুর্বরেণ্যং - যিনি এই ভূলোক, দ্যুলোক, সবিতারূপে বিভাসিত।

মহাবিশ্বে প্রতিমুহূর্তে যেমন সৃষ্টির যজ্ঞ চলছে, তেমনি চলছে ধ্বংসলীলা। তীক্ষ্ণ আর্তনাদের মত তীব্র বিকিরণ ছড়িয়ে দিয়ে দেশকালের গহ্বরে মিলিয়ে যাচ্ছে নক্ষত্র, গ্রহ, বস্তুপিণ্ড, আবার কোথাও প্রভাতসূর্য পরম মমতায় তার কিরণ মাখিয়ে দিচ্ছে তুচ্ছ তৃণের গায়ে। আমাদের জাগতিক জ্ঞান সৃষ্টিকে মমতা আর ধ্বংসকে ক্রুরতার সাথে এক করে দেখে। ঈশ্বরকে তাই আমরা কখনও পরম করুণাময় আবার কখনও রুদ্রবেশে কল্পনা করি। হয়তো তা আমাদের চিন্তার, আমাদের কল্পনার দীনতা।এই বিশ্বের যদি কোন সত্তা থেকে থাকে তা হয়তো সত্যিই নির্গুণ। যে মাত্রায় বা ডায়মেন্সনে আমরা বাঁধা পড়ে আছি, তাতে কার্যকারণ আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে চলে। তার বাইরের সামগ্রিক ছবি হয়তো আমাদের বোধে কখনো ধরা দেবে না।

বহু প্রশ্ন- দর্শন, ধর্ম, বিজ্ঞান নিজের নিজের পথে তাদের উত্তর খুঁজে চলেছে। পথ দুরূহ- সৃষ্টির একটি ক্ষুদ্র অংশ হয়ে যেখানে আমরা পূর্ণ সৃষ্টিকে বোঝার প্রয়াস করছি, কাজটা সহজ হওয়ার কথা নয়।আদৌ সেটা সম্ভব কিনা তাও জানা নেই। আদিকাল থেকে মানুষের সংগ্রাম চলেছে প্রতিকূলতাকে জয় করে সুখ পেতে, সেই সুখ, যা আমাদের দেহকে আরাম দেয়। তবু জিজ্ঞাসুরা একসময় বুঝতে পেরেছিলেন এই সুখ আপেক্ষিক, তা সত্য হতে পারে না। ‘যো বৈ ভূমা তৎ সুখম্ নাল্পে সুখমস্তি’। বিরাটের সংস্পর্শে এসে যে সুখ দেহকে ছাপিয়ে যায়, তাই অক্ষয়, তাই অমৃত, তাই আনন্দ। ব্রহ্মাণ্ডের যে কোণই সে দাঁড়িয়ে থাক, যদি তার চিন্তাধারা উন্নত মানের হয়, সে সৃষ্টির বিশালতাকে জরীপ করার প্রয়াস করবেই।আর এই প্রয়াসই তাকে সন্ধান দেবে আনন্দের। কে জানে, এর মধ্যেই নিহিত হয়ে আছে কিনা স্রষ্টার গূঢ় অভিপ্রায়?

Friday, July 15, 2016

পৃথিবী ও প্রাণ (ফিরে দেখা)

II দেবাশিস ভট্টাচার্য II

এক

সে এক অন্য পৃথিবী। বিষাক্ত বায়ু তাকে ঘিরে রেখেছে।গর্ভে তার একতাল লাভা যেন ফুঁসছে। শূন্য থেকে ছিটকে আসা উল্কাপিণ্ড আছড়ে পড়ছে অবিরাম। থেকে থেকে তার জঠর ফুঁড়ে লাভা ও গ্যাস তীব্রবেগে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। সূর্য, যে ওই পৃথিবীর মতই নবীন, তার খর-দীপ্তি দিয়ে ঝলসে দিচ্ছে ছোট গ্রহটিকে। উত্তাল সমুদ্র আর কেঁপে কেঁপে ওঠা মেদিনীর মধ্যে যেন অবিরাম যুদ্ধ চলছে, সেইসঙ্গে দিনরাত আকাশ চিরে করাল বজ্রপাত।বাতাসের তীব্র বিষাক্ত গ্যাস বৃষ্টির সাথে মিশে ঝরে পড়ছে। নিঃসংশয়ে বলা যায় জলে স্থলে কথাও কোন প্রাণের চিহ্নমাত্র নেই।

উন্মত্ত সেই কুম্ভীপাকে আশ্চর্য ভাবে ধ্বংস হাতছানি দিল সৃষ্টিকে। বজ্রাঘাতে ভাঙতে জুড়তে থাকা অণু-পরমাণু থেকে সৃষ্টি হয়ে প্রাণের মৌল উপাদান, জৈব অণুগুলি রক্তবীজের মত ছড়িয়ে পড়ল জলে- স্থলে। কিন্তু পৃথিবীর বুকে সেই ভয়ঙ্কর পরিবেশে তাদের বিকাশ ছিল অসম্ভব। তাই সমুদ্রের গভীরে এক কোণে কয়েকটি অণু পাশাপাশি জুড়ে সৃষ্টি করল প্রথম জীব অথবা জীবাণু। শুরু হল জীবনের জয়যাত্রা।

শুধুই অণুর শৃঙ্খল, জীবকোষ তখনও গড়ে ওঠে নি। তবু জীবনের আদি প্রবৃত্তি অমোঘ লক্ষণ হয়ে দেখা দিল- এরা নিজেদের প্রতিলিপি তৈরি করে ছড়িয়ে যেতে থাকলো। উল্কাপাতের মাত্রা কমে আসায় সমুদ্রপৃষ্ঠে জীবাণু ছড়িয়ে যেতে থাকলো। ততদিনে জীবকোষ পূর্ণতার দিকে এগিয়ে গেছে, পরিপার্শ্ব থেকে প্রাণরস শুষে নেওয়ার প্রক্রিয়া কোষে শুরু হয়েছে। সেই প্রক্রিয়াতে কিছু জীবাণু অক্সিজেন নিঃসরন করত যা মাটিতে মিশে থাকতো। একসময় সেই অক্সিজেন বায়ুমণ্ডলে জমা হতে থাকে। পৃথিবীর বাতাস দ্রুত বদলাতে থাকে। প্রায় অদৃশ্য ওই জীবাণুরা এভাবে সূচনা করছিল এক নূতন পৃথিবীর।

সূর্যের আলোয় অক্সিজেন ভেঙ্গে তৈরি হয় ওজোন। বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে জমা হয়ে সেই ওজোন প্রতিহত করে সূর্যের মারাত্মক অবলোহিত রশ্মি, যা জীবকোষকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। নতুন বায়ুমণ্ডলের আচ্ছাদনে সমস্ত গ্রহ জুড়ে শুরু হল জীবনের প্রগতি। বহুকোষী প্রাণী সমস্ত দেহ পেতে নরম সূর্যালোক শুষে নিয়ে বেড়ে উঠতে লাগলো, সবুজে ছেয়ে গেল পৃথিবীর জলভাগ। জলে ভেসে বেড়ানো শ্যাওলা থেকে জঙ্গম প্রাণীর বিকাশ হল যারা জল কেটে দূর- দুরান্তে চলে যেতে পারে।

ততদিনে পৃথিবী অনেক ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে। বারবার পৃথিবীতে নেমে আসছে তুষারযুগ।অতল বরফের নীচে যুগ যুগ ধরে সুপ্ত থেকে হিম যুগের শেষে প্রতিবারই অদম্য প্রাণ জেগে ওঠে, এক থেকে বহু হয়ে ছড়িয়ে যায়।এমনই এক হিম যুগের শেষে জীবনের ইতিহাসে ঘটে যায় এক বিপ্লব।

জীবনের ইতিবৃত্ত খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীদের একমাত্র সম্বল ফসিল। জীবের বিকাশ সম্পূর্ণ হওয়ার আগে তাদের শরীরের কঠিন অংশ ছিল খুবই সামান্য, তাই বিজ্ঞানীদের ভরসা করতে হয়েছে পরোক্ষ চিহ্নে- যেমন পাথরের গায়ে রেখে যাওয়া অস্পষ্ট রেখায়। জীবনের ঊষাকালের ইতিহাস তাই অনেকটাই অনুমাননির্ভর। প্রায় সাতান্ন থেকে পঞ্চান্ন কোটি বছর আগের ভূস্তরের মধ্যেপাওয়া যায় বহু ফসিল যা বৈচিত্রে তার পূর্বসূরিদের তুলনায় একেবারে অভিনব। অর্থাৎ কোন অজ্ঞাত কারণে জীবজগতে ওই সময়ে আসে বৈপ্লবিক পরিবর্তন যাতে বহু নতুন নতুন জীবের উদ্ভব হয়। তারাই আজকের জীবজগতের বিভিন্ন শাখার পূর্বসূরি।কি করে জানা যায় সেই বংশলতিকা ?

জীবকোষ তার বিকাশের পথে রেখে গেছে এক মূল্যবান অভিজ্ঞান। কোষের কেন্দ্রে থাকে কিছু অণুর শৃঙ্খল, যাকে বলা যায় জীবনের পদাবলী। তাতে গাঁথা থাকে জীবটির পূর্ণাঙ্গ রূপের যাবতীয় তথ্য। প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মে সেই তথ্য সঞ্চারিত হয়ে চলে। আদিতম প্রাণ - গাছপালা জীবজন্তু আমাদের সবার যে বীজপুরুষ, তার কোষের থেকে আমার কোষে অযুত নিযুত যুগের সিঁড়ি বেয়ে আসা পদাবলীটি আজ শত শত মহাকাব্যের থেকেও বিপুলাকার, কিন্তু খুঁজলে তাতেও পাওয়া যায় আদি কবিতার শব্দ, পদ। সেই চিহ্ন ধরে জীবের বিবর্তনের একটি রূপরেখা তৈরি করে নেওয়া যায়।

পঞ্চান্ন-সাতান্ন কোটি বছর আগের সেই যুগেই জল থেকে স্থলে জীবের সঞ্চার হয়। প্রথমে উদ্ভিদ, পরে প্রাণী। যে পরাগ কোষ জলে ভেসে গিয়ে পরাগ মিলন ঘটাত তাই রেণুর আকারে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল। পৃথিবীর মাটির রুক্ষ ধুসরতা ঢেকে গেল শ্যামলিমায়। বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের পরিমান আরও বাড়ল। বায়ুমণ্ডলে জমা হতে লাগলো জলবাহী মেঘ, বৃষ্টি হযে যা নেমে আসতে লাগলো পৃথিবীর বুকে।


দুই

অনেক ধ্বংস, বিপর্যয়ের পথ পেরিয়ে কোন একটি সকালে এমন একটি দৃশ্য রচনা হোল-নীল আকাশের নীচে সমুদ্র, তটে আছড়ে পড়া ঢেউ, হাওয়ায় আন্দোলিত গাছপালা- এই গ্রহের প্রকৃতি সেজে উঠে যেন কার আগমনের প্রতীক্ষায় বসে। এই গ্রহের বুকে চলমান জীব তখন কিছু ক্রিমি ও কীট। নিতান্তই জৈবিক তাদের চেতনা- ক্ষুধা, আত্মরক্ষা ও বংশবিস্তার। খুবই সীমিত তাদের দৃষ্টি ও অনুভূতি; ক্ষুদ্রকায় তাদের মস্তিষ্ক। যেন প্রকৃতির রূপ বর্ণ গন্ধ শব্দ ধরা দেবে বলে দৈহিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত স্তরে একটু একটু করে বিকাশ হতে লাগলো তাদের মস্তিষ্কের।

এই বিকাশ নিরবচ্ছিন্ন হয় নি। মাঝে মাঝেই পৃথিবীর বুকে নেমে এসেছে ভয়ঙ্কর কোন না কোন দুর্যোগ, যাতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে অধিকাংশ প্রাণী ও উদ্ভিদ। তবু প্রাণের বীজ আবার, বারবার অঙ্কুরিত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। প্রাণের উত্তরাধিকার নিয়ে প্রতিবারই আশ্চর্য ভাবে রক্ষা পেয়ে গেছে কিছু প্রজাতি- যারা জীবনের ইতিহাসের নতুন অধ্যায় শুরু করেছে এই গ্রহে।

এভাবেই পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে কীটপতঙ্গের পালা শেষ হয়ে শুরু হয় সরীসৃপযুগ। জীবনধারণের সংগ্রামে টিকে থাকতে গিয়ে তাদের মস্তিষ্ক দ্রুত বিকশিত হয়ে ওঠে। আকৃতিতে বিশাল এই জীবদের মধ্যে তৃণভোজী ও মাংসাশী দুই প্রজাতিই আলাদা ভাবে বিকশিত হয়। মাংসাশী প্রাণীদের জটিল মস্তিষ্কের অন্যতম কাজ ছিল হিংস্রতাকে আরও শানিয়ে জলে স্থলে তাদের আধিপত্য কায়েম করা।পৃথিবীতে রক্তপাতের ইতিহাসের সেই শুরু।

গ্রহময় কোন ভয়ংকর বিপর্যয়ে সরীসৃপ যুগের ওপর যবনিকা নেমে আসে। তাদেরই একটি শাখা ডানায় ভর করে আকাশে পাড়ি জমিয়েছিল কোন এক প্রজন্মে।তারা বেঁচে যায়। পাখীর পূর্বপুরুষ এরা। আর বেঁচে যায় সরীসৃপদের আহার্য ক্ষুদ্রকায় কিছু স্তন্যপায়ী জীব।

ধ্বংসের বিভীষিকা পিছনে ফেলে পৃথিবীর বুকে জীবনের যাত্রা সাময়িক ব্যহত হলেও থেমে যায় না। ক্ষুদ্রকায় স্তন্যপায়ীদের শাখাপ্রশাখা ক্রমে অধিকার করে নেয় পৃথিবীর স্থলভাগ। মস্তিষ্কের বিকাশের ফলেএদের মধ্যে ক্ষুধা, হিংসা, ভয় এসবের বাইরে জন্ম নেয় আবেগ, উদ্বেগ, সন্তানস্নেহ। জৈবিক আকুতি আত্মরক্ষার সীমা অতিক্রম করে। স্বার্থের পরিসরকে বিস্তৃত করার এই ধারা সময়ের সাথে, প্রজাতির বিবর্তনের সাথে আরও প্রসারিত হতে থাকে। প্রবৃত্তির এমন উত্তরণ টিকে থাকার লড়াইতে স্তন্যপায়ী জীবদের সাহায্য করেছিল বলেই বিবর্তন একে আরও এগিয়ে নিয়ে যায়।

পৃথিবীর বুকে জীবের বিকাশের সম্পূর্ণ কাহিনীটি আমরা এখনও জানতে পারিনি। ফসিল ঘেঁটে জীবের শারীরিক বিকাশ নিয়ে হয়তো অনেক তথ্যই জানা যায়, কিন্তু মানসিক বা বৌদ্ধিক বিকাশের সুস্পষ্ট ছবি এখনও আমাদের অনায়ত্ত। মূলতঃ মাথার খুলির আয়তন থেকে ধারণা করা হয় কোন জীব কতটা বুদ্ধিমান ছিল। কিন্তু সেই বুদ্ধি কতটা বিকশিত ছিল অর্থাৎ ক্ষুন্নিবৃত্তি, আত্মরক্ষা, বংশবিস্তার - এসব আদিম চাহিদা মিটিয়ে আরও উন্নত স্তরের চিন্তাধারায় তারা সক্ষম ছিল কি না, তার কোন স্পষ্ট ধারণা পাওয়ার উপায় এই মুহূর্তে আমাদের জানা নেই। ভিন্ন ভিন্ন মনোবিজ্ঞানীরা ভিন্ন ভিন্ন তত্বের অবতারণা করেছেন, কিন্তু কোনটাই অসংবাদিত নয়। তাই হয়তো আমরা কখনই সঠিক জানতে পারব না, কোন জীবটির চেতনায় প্রথম এই উদার আকাশ আর শ্যামল ধরা, এই রূপ বদলাতে থাকা প্রকৃতি ছায়া ফেলেছিল; রাতের আকাশের তারা বয়ে এনেছিল রহস্যময় কোন অস্তিত্বের ইঙ্গিত।


তিন

স্তন্যপায়ীদের বিচরণ ছিল বৃক্ষের শাখায় শাখায়। একসময় এরা নেমে এল মাটিতে। হাতের ব্যবহার শুধু চলনে সীমিত না থাকায় তাদের জীবনধারণে বড় পরিবর্তন আসতে থাকে। গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনে সম্পর্ক পরিবারের বাইরেও বিস্তৃতি পায়, এই পরিস্থিতির সাথে তাল মেলাতে মস্তিস্ককে আরও বিকশিত হয়ে উঠতে হয়। জান্তব প্রবৃত্তির স্বার্থপরতা বা সন্তান স্নেহের আবেগকে অতিক্রম করে তার চিন্তার জগত বিস্তৃত হল সামাজিক পরিসরে – সে গোষ্ঠীর ভালোমন্দ নিয়ে ভাবতে শুরু করল। এই পর্যায়ে তার মস্তিষ্কের দ্রুত বিকাশ ঘটে। উন্মেষ হয় কল্পনাশক্তির; মন কাল্পনিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা আয়ত্ত করে।

জীবের আকারের সাথে সাথে মস্তিষ্কের আকার বৃদ্ধি পাবে- এতে অভিনব কিছু নেই। কিন্তু এই কপিকুলের মস্তিষ্কে ‘ইন্সুলার কর্টেক্স’ নামের একটি অঞ্চল দ্রুত বিকশিত হয়ে উঠে তাদের আচার আচরণে আমূল পরিবর্তন এনে দেয়। আকারে সর্ববৃহৎ না হলেও এদের মস্তিষ্ক অপেক্ষাকৃত জটিল চিন্তাভাবনার উৎস হয়ে ওঠে। বানর থেকে মানুষের বিবর্তনের পথে এই ইন্সুলার কর্টেক্সে নতুন নতুন অঞ্চলের উদ্ভব হয়েছে। সেই সঙ্গে জন্ম নিয়েছে সহানুভূতি, গোষ্ঠীচেতনা, আবেগ, হতাশা, বিশ্বাস, সন্দেহ, ভালোবাসা।
এম আর আই এর মত ইমেজিং এর নতুন সব পদ্ধতি আবিষ্কারের ফলে মানুষের মস্তিষ্ক নিয়ে গভীর অনুসন্ধান সম্ভব হয়েছে। মানুষের মনের কোন আবেগের সাথে তার মস্তিষ্কের কোন অংশ যুক্ত এসব তথ্য আজ অনেকটাই জানা গেছে। দেখা গেছে ইন্সুলার কর্টেক্স খুবই অদ্ভুত একটি অঙ্গ। সঙ্গীত, ভাস্কর্য- এসব নান্দনিক বোধের উৎস এই অঙ্গে, যা মানুষের চিন্তাকে পৌঁছে দেয় ঈশ্বরের দরজায়। আবার ঘৃণা, হতাশা, মাদকাসক্তিও জন্ম নেয় একই অঞ্চলে। এর ফলে তার সামনে যুগপৎ স্বর্গ ও নরক, দুয়ের দরজাই খুলে যায়।

হয়তো এই প্রথম, সৃষ্টির কোন জীবের মনে সৃষ্টিকে নিয়ে বিস্ময়বোধ ও মুগ্ধতার জন্ম নেয়। তার সূত্র ধরে আসে চারপাশের জগতকে নিয়ে প্রশ্ন আর তার উত্তরের সন্ধান।অনন্ত মহাকাশ তাকে ঘিরে রেখেছে মায়াজালের মত, তারার আলো সুদুরের সঙ্কেত নিয়ে তার কাছে পৌঁছয়। তার বিস্ময়ের দৃষ্টি প্রসারিত হয় মহাশূন্যের গভীরে। বিন্দুবৎ কিছু কণা যেন অপরিমেয়, অসীম জগতে তার স্থান খোঁজে। সেই সন্ধান আজও অব্যহত।

লক্ষাধিক বছরের তার ইতিহাসের অধিকাংশ অতিবাহিত হয় অনিশ্চিত প্রকৃতিকে বুঝতে আর তাকে জীবনসংগ্রামে সহায় করতে। কিন্তু তারপরের সংগ্রাম চলে তার নিজের মস্তিষ্কের মধ্যে- এক অংশের সাথে অন্য অংশের।

যেসব অনুন্নত জীব প্রবৃত্তির বশ তারা স্বার্থত্যাগ করতে পারে না, কিন্তু ক্ষুৎপিপাসা, কামের নিবৃত্তি হয়ে গেলে তারাও শান্ত হয়। প্রবৃত্তিকে দমন করা যার আয়ত্বে সে যেমন ক্ষুৎপিপাসা ভুলে থাকতে পারে তেমনি আবার পিপাসা মেটার পরেও আকণ্ঠ পান করে যেতে পারে। তাই তার লোভের কোন গণ্ডী থাকে না। ইন্সুলার কর্টেক্সে নিহিত আসক্তি শুধু নেশার দ্রব্য নয়, ঘৃণা ও বিদ্বেষকেও অবলম্বন করতে পারে। মানুষের ইতিহাসে তাই দুই বিপরীত মেরুর কাহিনী পুনরাবৃত হতে থাকে। আত্মজ, আত্মজন- এমনকি মানবজাতির জন্য সুখ- স্বার্থ ত্যাগ করে দুঃখকে বরণ করার ইতিবৃত্তের পাশাপাশি অর্থহীন ক্রুর হিংসায় নিজেরই প্রজাতিকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করার কাহিনী।

প্রাণের বিকাশের পর থেকে পৃথিবীর বুকে বার বার নেমে এসেছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়- প্রকৃতিদেবী যেন পরম মমতায় ছবি এঁকে হঠাৎ নিষ্ঠুর ভাবে সে ছবি মুছে দিয়েছেন বার বার।তবু প্রাণ ধ্বংস হয়ে যেতে যেতেও প্রবল জীবনতৃষ্ণা নিয়ে টিকে থেকেছে পৃথিবীর কোন এক কোণে- ভাবীকালে মাথা তুলে দাঁড়াবে বলে। আবার বিবর্তন, আবার বিকাশ এবং আবার নিয়তির মত সেই বিনাশ। বিকাশ আর ধ্বংসের চক্রাকার আবর্তনের পথে বিবর্তন এগিয়ে নিয়ে এসেছে জীবনকে কোটি কোটি বছরের পথ ধরে। মানুষের চেতনায় ধরা দিয়েছে তার চারপাশের অদ্ভুত সুন্দর রহস্যঘেরা তার বাসভূমি এই পৃথিবী।দেশ ও কালের সুদুরে তার দৃষ্টি সন্ধান দিয়েছে প্রকৃতির এক অচিন্তনীয় রূপের। এখনও কত বিচিত্র রহস্য তার চেতনায়, তার বোধিতে ধরা দেবে বলে অপেক্ষা করে আছে। প্রকৃতিদেবী কি মানুষকে সে সময়টুকু দেবেন?

এর থেকেও বড় প্রশ্ন হচ্ছে মানুষ কি মানুষকে, সেই সময়টুকু দেবে? পাশাপাশি দরজা দুটির মধ্যে স্বর্গের দরজাটি কোন প্রাচীন কালেই বন্ধ হয়ে গেছে, সর্বাঙ্গে তার মরচে। নরকের দরজাটি যখন তখন খুলে যাচ্ছে। তার ওপারে মানুষের সীমাহীন লোভের গহীন অন্ধকার ।

বন্ধ দরজা অলৌকিক ভাবে খুলে যাওয়ার মত যদি মানুষের সুবুদ্ধি তাকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচায়, তবে তার সাথে বেঁচে যাবে এই পৃথিবী, তার বায়ুমণ্ডল, তার চরাচরে ছড়িয়ে থাকা প্রাণ। সূর্য যতদিন আলো দিয়ে যাবে ততদিন।
অন্যথায় তার পরিবেশের সাথে মানুষও জীবাশ্ম হয়ে কালের গহ্বরে চলে যাবে। কিন্তু প্রাণ হয়তো এতো সহজে পৃথিবীর বুক থেকে মুছে যাবে না। সে কোন সুদুর অতীতে সুপারনোভার গর্ভে জন্ম নেওয়া অণু একত্র হয়ে তৈরি করেছে এই গ্রহ, রচনা করেছে এক থেকে বহু হওয়ার মন্ত্র। অর্বুদ-কোটি বছরের তার নিয়তি এক লহমায়মুছে যাওয়ার নয়। হয়তো গহন সমুদ্রের কোন কন্দরে লুকিয়ে থাকবে কিছু অণুর শৃঙ্খল- কোনো নতুন প্রভাতে প্রাণের পদাবলী নতুন করে রচনা করবে বলে।

(শেষ)

ফৈয়াজ খাঁ সাব কা মাজার



|| দেবাশিস ভট্টাচার্য ||

বঢ়োদরা অর্থাৎ বরোদা স্টেশনের বাইরে দাঁড়িয়ে আছি গাড়ির অপেক্ষায়। ভোর পাঁচটা, তবু তখনও আলো ফোটেনি। টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তার ওপারে নতুন পুরনো হোটেলের সারি। এর মধ্যে একটা হোটেল অনেকটা জায়গা জুড়ে, সর্বাঙ্গে তার প্রাচীনতার ছাপ। কাঠের রেলিং দেওয়া দোতলার বারান্দায় টিম টিম করে জ্বলছে হলুদ বাল্ব, সারি সারি রুম গুলোতে বোর্ডার আছে কি নেই বোঝা যাচ্ছে না। দরজাগুলো কোনো ঐতিহাসিক কালে নীল রঙের ছিল - তার কব্জাগুলোতে হয়তো মরচে ধরে গেছে। একসময়- যখন সয়াজি রাও গায়কোয়াড়ের বরোদার খ্যাতি সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়েছে আর তাতে আকৃষ্ট হয়ে ছুটে আসছেন দেশ বিদেশের জ্ঞানী গুণীরা- বহু ভাগ্যান্বেষী রাজানুগ্রহ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এই শহরে এসে এমনই কোন হোটেলে ঠাঁই নিত। তখন দুরপাল্লার বাহন বলতে ছিল রেলগাড়ি, তাই হোটেলগুলো সাধারণতঃ হতো স্টেশনের কাছেই। হয়তো তরুণ আব্দুল করিম খাঁ তার ভাই আব্দুল হককে নিয়ে অথবা যুবক ফৈয়াজ খাঁও ওইরকমই কোনো এক রুমে এসে উঠেছিলেন। হয়তো তাদের কড়ি বরগা দেয়াল সাক্ষী হয়ে আছে উদীয়মান ওস্তাদদের উদয়াস্ত সাধনার। ভাবলেই গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।

দীর্ঘদিন পর বরোদাতে আসা। তাই স্টাফ কলেজের, এখন যার নাম হয়েছে NAIR, হোস্টেলে যাওয়ার পথে স্মৃতির সাথে বর্তমানকে মিলিয়ে নিতে গিয়ে বারবার খেই হারিয়ে ফেলছিলাম। তবু রাজপ্রাসাদের সামনের রাস্তাটা একই রকম আছে, মাঝে মাঝে দু একটা বহুতল, দোকান, রেস্তোরাঁ বাদে। সিংহদ্বারের উল্টোদিকে রাস্তার ওপারে কিছু পুরনো মহল ভগ্নদশায় এখনও দাঁড়িয়ে আছে, কবে রিয়েল এস্টেটের কারবারিদের কব্জায় যাবে সেই প্রতীক্ষায়। রাজদরবারে অথবা রাজকীয় প্রতিষ্ঠানে যাঁদের বিশেষ স্থান ছিল, তাঁরা ছিলেন এইসব মহলের বাসিন্দা। হয়তো এরই কোন একটাতে ছিলেন আমাদের আলীসাহেব, সৈয়দ মুজতবা আলী।

বরোদার সেই স্বর্ণযুগের যারা ছিলেন হোতা, তাদের চিহ্ন যা কিছু রয়েছে, সব ওই প্রাসাদ সংলগ্ন ম্যুজিয়ামে। শুধু একজনই আমৃত্যু বরোদার মায়া কাটাতে পারেন নি, মৃত্যুর পর দফন হয়েছেন তাঁর যৌবনের উপবন, বার্ধক্যের বারানসীতে। তিনি ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ সাহেব।

শহরের কোন অঞ্চলে তাঁর মাজার, সেটা আমার জানা ছিল না। খানিকটা অনুসন্ধানের ফলে জানতে পারলাম, সেটা খাসওয়াড়ি মহল্লাতে, আরাধনা সিনেমার কাছে। এক ছুটির দিনে আরাধনা সিনেমার কাছে অটো থেকে নেমে খাসওয়াড়ির দিকে হাঁটা দিলাম। হাঁটতে হাঁটতে খাসওয়াড়ি পৌঁছে গেলাম, তবু মাজার দূরে থাক, কোন গোরস্থানই চোখে পড়লো না। উল্টোদিক ধরে আবার হাঁটতে হাঁটতে কিছুদুর আসার পর একটি মসজিদ চোখে পড়লো। গেট খোলা, নির্জন। ভেতরে ঢুকে 'জী কোই হ্যায়' হাঁক পাড়তে এক বৃদ্ধ উদয় হলেন, হাতে উর্দু কাগজ। 'য়ঁহা আসপাশ কহীঁ ফৈয়াজ খাঁ সাবকা মাজার হ্যায়?' বৃদ্ধের মাথা নাড়া আর চোখ মুখ দেখে বুঝতে পারলাম কস্মিন কালেও তিনি ওই নাম শোনেন নি। চলে যাচ্ছি যখন, বললেন, 'আগে চৌড়ায়া পে এক কব্রীস্তান হ্যায়, ওঁহা পাতা কর লিজিয়ে।' চৌমাথায় এসে ভালো করে দেখেও কিছু হদিশ করতে পারলাম না, অধিকাংশই মোটর পার্টসের দোকান। শেষ চেষ্টা হিসেবে একটি গ্যারেজের সামনের দোকানে এক যুবক চা খাচ্ছিল, তাকে জিজ্ঞেস করলাম। 'ফৈয়াজ খাঁ? গায়ক?' আহা! এ কী শুনলাম! আমার মাথানাড়ার প্রাবল্যে খানিকটা বিস্মিত যুবকটি গ্যারেজের পেছনের একটি মাঠ দেখাল। বলল- ওই দিকে একটি গেট আছে, আবার খানিকটা ঘুরে রাস্তার দিকেও একটি গেট আছে। কোনটা খোলা আছে বলতে পারবে না। দিশারীটিকে অশেষ ধন্যবাদ জানিয়ে গ্যারেজের পেছনের মাঠে গিয়ে দেখলাম উঁচু প্রাচীর ঘেরা একটা কিছু রয়েছে, কিন্তু গেট বন্ধ। অগত্যা রাস্তার দিকের গেটের সন্ধানে গেলাম। ওপরের সাইন বোর্ড দেখে জানলাম, সেটি শিয়া কব্রীস্তান। সে গেটও বন্ধ, কখন খোলে কেউ বলতে পারলো না। তবে গেটটি তেমন উঁচু নয়, তাই ভেতরে দেখা যায়। মাজার বলতে, কম্পাউন্ডের বাঁদিকের দেয়াল সংলগ্ন আচ্ছাদনের নীচে একটি কবর আর দুপাশে জাফরি কাটা দেয়াল। সেটিতেই শায়িত কণ্ঠ সঙ্গীতের শেষ সম্রাট।

ইচ্ছে ছিল তাঁর কবরে ফুল দেব, সে ইচ্ছে পূরণ হল না। বাইরে থেকেই প্রণাম জানালাম। জানিনা আজ আর কেউ ওই গেট খুলে তাঁর মাজারে মোমবাতি জ্বালিয়ে দেয় কিনা, সে সম্ভাবনা ক্ষীণ। গুজরাতে দাঙ্গার সময় কিছু নরাধম নাকি তাঁর মাজারে জ্বলন্ত টায়ার নিক্ষেপ করেছিল, তারা আমারই ধর্মের, তাই সেই লজ্জা নিয়েই মাথা নত করে রই। তিনি সঙ্গীত দিয়ে ঈশ্বরের চরণ স্পর্শ করেছেন, যদি স্বর্গ বা বেহেস্ত বলে কিছু থাকে, তাতে শরণ পেয়েছেন। ওই কলুষ তাঁকে তাই স্পর্শ করে না। যা কিছু অগৌরব, হতাশা, ক্ষতি তা আমাদের, তা আমার।